

দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গত মার্চ মাসে রেকর্ড ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী যোদ্ধারা। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের আড়ালে চাপা পড়ে আছে তাদের হাহাকার আর অমানবিক বঞ্চনার গল্প। আজ মহান মে দিবসে যখন ‘সুস্থ শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নবপ্রভাত’ প্রতিপাদ্যে দিবসটি পালিত হচ্ছে, তখন বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা চরম উদ্বেগজনক।
লাশের মিছিলে দীর্ঘ হচ্ছে শোক
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন প্রবাসীর লাশ দেশে ফিরছে। গত বছরই ৪ হাজার ৯৭২ জন শ্রমিকের মরদেহ এসেছে। মার্চ মাসে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিস যাওয়ার পথে ২০ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে নিয়মিতই ফিরছে স্বজনহারাদের কফিন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসে মৃত কর্মীদের ৩১ শতাংশেরই মৃত্যু হচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে, যার মধ্যে ১৬ শতাংশ দুর্ঘটনা এবং ১৫ শতাংশ আত্মহত্যার শিকার।
নারী শ্রমিকদের আর্তনাদ
১০ লাখের বেশি নারী বর্তমানে বিদেশে কর্মরত থাকলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। ব্র্যাকের তথ্যমতে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে শূন্য হাতে ফিরেছেন। সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে এক নারী গৃহকর্মী অন্তঃসত্ত্বা ও মুমূর্ষু অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। ভাষা না জানা এবং আইনি সুরক্ষার অভাবে মাসের পর মাস বিনা বেতনে কাজ করা ছাড়াও শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
দালাল ও সিন্ডিকেটের বিষফোঁড়া
বিদেশে যাওয়ার উচ্চ খরচ এবং দালাল চক্রের প্রতারণা শ্রমিকদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে। অন্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণ খরচ করেও অনেক শ্রমিক বিদেশে গিয়ে কাজ পাচ্ছেন না। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. তাসনিম সিদ্দিকী জানান, রাষ্ট্র ও অসাধু সিন্ডিকেটের যোগসাজশে নিম্নমানের ভিসায় লোক পাঠানো হচ্ছে, যার ফলে দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি হচ্ছে না। অভিবাসন খরচ কমাতে না পারা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণের উচ্চ সুদ (৯ শতাংশ) শ্রমিকদের ঋণের জালে আটকে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি: জবাবদিহি ও দক্ষতা বৃদ্ধি
অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার রেমিট্যান্স, ইন্স্যুরেন্স ও ফিঙ্গারপ্রিন্টের নামে টাকা আদায় করলেও শ্রমিকদের সেবা প্রদানের মান সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিয়োগকারী দেশের সরকারকে দায়বদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাষ্ট্রকে শ্রমিকের জীবনের মূল্য দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি এবং অবৈধ ভিসা সিন্ডিকেট নিষিদ্ধ করতে না পারলে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই কান্না থামবে না। মে দিবসের ভোরে এই ‘চাপা কান্না’ মোচনের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা ও কার্যকর আইনি কাঠামো।
মন্তব্য করুন