

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের (নজরুল ইসলাম) বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অপব্যবহারের অভিযোগে দেশবাসীর ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতারণা ও জালিয়াতির ইতিহাস থাকা এই ব্যক্তি মাত্র ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তর, নিম্ন আদালতের বিচারক ও সরকারি আইনজীবী নিয়োগে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ দেশবাসী এখন স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
নামেই জালিয়াতি
আসিফ নজরুলের আসল নাম নজরুল ইসলাম। এই নামেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ব্যাচের মেধাবী শামসুদ্দিন আহমেদকে ঠেলে শিক্ষকতা পেয়েছেন ‘অলৌকিক উপায়ে’— দাবি করেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। এলএলএমে তৎকালীন শিক্ষক এরশাদুল বারী তাঁকে ‘জোর করে’ প্রথম শ্রেণি দিলেও পরবর্তীতে সেই বারীর সঙ্গেই নজরুল করেন ‘বিশ্বাসঘাতকতা’।
চাকরি–সাংবাদিকতা–দাম্পত্য: ছলনার পালা
সাংবাদিকতায় গুরু শাহরিয়ার কবিরকেও ‘ফেলে দিয়েছেন’ আসিফ। শাহরিয়ার কারাবন্দি থাকলেও আসিফ তাঁর জন্য কিছুই করেননি। অথচ অর্থের বিনিময়ে গানবাংলার তাপসসহ বহু জামিন করিয়েছেন।
দাম্পত্য জীবনেও নাকি কারসাজি: প্রথম স্ত্রীকে বিদেশে ক্যারিয়ারের জন্য বিয়ে, দেশে ফিরে তালাক। দ্বিতীয় বিয়ে রোকেয়া প্রাচীকে (আওয়ামী লীগ আমলে ঘনিষ্ঠতার জন্য)। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রাচীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ এবং শিলা আহমেদের (হুমায়ুন আহমেদের কন্যা) সঙ্গে পরকীয়া। এভাবেই প্রতিটি সম্পর্ককে ‘প্রয়োজনের হাতিয়ার’ বানিয়েছেন তিনি।
১৪ মাসে ২৮২ সাব-রেজিস্ট্রার বদলি : ‘ঘুষের বিনিময়’?
সাবেক এই উপদেষ্টা দাবি করেন, সব নিয়ম মেনে বদলি হয়েছে। কিন্তু নথি বলছে উল্টো। নিবন্ধন অধিদপ্তরের মোট ৪০৩ সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয় আঠারো মাসে। বিস্ময়কর উদাহরণ:
মনীষা রায় : জলঢাকা → হরিপুর → হাকিমপুর → পীরগঞ্জ (বারবার বদলি)
রেহানা পারভীন : রহমতপুর → কাঁঠালিয়া (মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বদলি স্থগিত করে মুলাদীতে যোগদান)
শাহ আবদুল আরিফ : কাশিয়ানী → দৌলতপুর (যোগদানের আগের দিন বদলি স্থগিত)
অভিযোগ, ঘুষের টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত রাখারও প্রমাণ আছে। কেউ কেউ সাত মাসে চারবার বদলি হয়েছেন।
আইনজীবী নিয়োগে রেকর্ড ভাঙা ‘অপচয়’
যেখানে সর্বোচ্চ দরকার ১০-১২ জন সরকারি আইন কর্মকর্তা, সেখানে আসিফ নজরুল নিয়োগ দিয়েছেন ৬৫৯ জন!
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ১০৩ জন ডেপুটি এজি ও ২৩০ জন সহকারী এজি (এর আগে কখনো এমন ছিল না)
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে মাত্র ৪ জন কর্মকর্তা প্রয়োজন, নিয়োগ দেন ৮৪ জন
জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রয়োজন ৯ জন, নিয়োগ দেন ৬১ জন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া ‘রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের অপচয়’ ছাড়া আর কিছু নয়। অভিযোগ, প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি এসব নিয়োগের মূল চালিকাশক্তি।
‘ভুয়া তথ্য’ থেকে ‘মেয়ের নামে বাড়ি’ বিতর্ক
আসিফ নজরুল ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে চাকরি করে— এমন ‘অসত্য তথ্য’ রাষ্ট্রীয় প্রচারেও ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ। এছাড়া ইস্কাটনে মেয়ের নামে বাড়ি আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিকেরা। রোকেয়া প্রাচী আয়কর নথিতে ‘স্বামীকর্তৃক প্রাপ্ত’ উল্লেখ করে যা নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
স্বাধীন কমিশন দাবি
সর্বশেষ ৩০ এপ্রিল আসিফ নজরুল অভিযোগ অস্বীকার করে ফেসবুকে পোস্ট দিলেও ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের তিনি কোনো উত্তর দেননি। দেশবাসীর পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠেছে, ড. ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনের প্রতিবেদনেই মিলবে ‘কে কত সাধু’— সেই জবাব।
মন্তব্য করুন