ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৩০ এপ্রিল ১৯৭১: ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধে জয়ী হবেই’

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
৩০ এপ্রিল ১৯৭১: ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধে জয়ী হবেই’

৩০ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি ঘটনাবহুল ও স্মরণীয় দিন। এই দিনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালা এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানান। অন্যদিকে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রংপুর ও শেরপুরে নির্মম গণহত্যা চালায়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন ও অবস্থান

নেপালের প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালা কাঠমুণ্ডুতে এক বিবৃতিতে বলেন, "বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন এবং গণহত্যার গভীর নিন্দা জানাই। আমি আশা প্রকাশ করি, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা এই যুদ্ধে জয়ী হবে।"

পাকিস্তানি প্রতিনিধির বক্তব্য

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত সেন্টো সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধি ইফতেখার আলী মুক্তিযুদ্ধকে "ভারতীয় চক্রান্ত" বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে, কিন্তু তারা সফলকাম হতে পারবে না এবং তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে।

লিবিয়ার গাদ্দাফির অবস্থান

লিবিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি লিবিয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আবদুর রউফ খানকে বলেন, “পাকিস্তানের ঐক্য বজায় রাখার জন্য ইয়াহিয়া খান সঠিক ব্যবস্থাই নিয়েছেন। লিবিয়ার পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা আছে পাকিস্তান সরকার, সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের ওপর।”

ঢাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষের বিশেষ ঘোষণা

৩০ এপ্রিল ঢাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ এক বিশেষ ঘোষণা দেয়। ঘোষণায় বলা হয়:

নাগরিকদের স্বাভাবিক কাজকর্মে ও কৃষিকাজে কেউ হস্তক্ষেপ করলে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে

৩০ জুনের মধ্যে বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে হবে

রংপুরের দমদমা ব্রিজ গণহত্যা

কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক হত্যাকাণ্ড

গভীর রাতে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক কোয়ার্টারগুলোতে হানা দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুখ বাঁধা কয়েকজন অবাঙালি চিনিয়ে দেয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের। একে একে ধরে নেওয়া হয়:

অধ্যাপক সুনীল বরণ চক্রবর্তী

অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী

অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায়

অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়

শিক্ষকদের রাইফেলের বাট দিয়ে বেধড়ক পিটুনি দেওয়া হয়। অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়ের সহধর্মিণী মঞ্জুশ্রী রায় স্বামীর ওপর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে এলে দোসররা তাকেও রেহাই দেয়নি।

দমদমা ব্রিজে হত্যাকাণ্ড

হানাদাররা শিক্ষকদের নিয়ে রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক ধরে দমদমা ব্রিজের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে রাস্তা সংলগ্ন বাঁশের ঝাড়ে হাত-পিঠ বাঁধা অবস্থায় সারিবদ্ধ করে দাঁড় করানো হয় শিক্ষকদের। তারপর হানাদারদের রাইফেলে গর্জে ওঠে — মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন সবাই।

নিহত হন:

অধ্যাপক সুনীল বরণ চক্রবর্তী

অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী

অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায়

অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়

মঞ্জুশ্রী রায়

একই রাতে অধ্যাপক আব্দুর রহমান ও অধ্যাপক সোলায়মানকেও নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদারেরা। পরে দমদমা ব্রিজের পাশের বাঁশঝাড়ে তাদের গণকবর দেওয়া হয়।

শেরপুরের ঝিনাইগাতির জগৎপুর গণহত্যা

৩০ এপ্রিল শেরপুরের ঝিনাইগাতির ধানশাইল ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামে পৈশাচিক কায়দায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি হানাদারেরা।

সেদিন শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে জগৎপুরের পাশের শংকরঘোষ গ্রাম থেকে স্থানীয় রাজাকার মজিবর, বেলায়েত, নজর ও কালামের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জগৎপুরের ত্রিমুখী আক্রমণ করে গ্রামটি ঘিরে ফেলে। হানাদার বাহিনীর তিনটি দল তিন দিক থেকে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে।

গ্রামবাসী প্রাণ বাঁচাতে পেছনের দিকের রঙ্গবিলের দিকে দৌড়াতে থাকে। কেউ সাঁতরে, কেউ বিলের দুপাড় ঘেঁষে পালানোর চেষ্টা করে। শুকনো জায়গা দিয়ে পালাতে গিয়ে হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ৪২ জন নিরীহ গ্রামবাসী — তাদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যারা পালাতে সক্ষম হন, তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে আশ্রয় নেন।

মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ

কর্নেল ওসমানীর রামগড় সফর

মুক্তিবাহিনীর প্রধান ও প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী খাগড়াছড়ির রামগড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি পরিদর্শন করেন এবং চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর নেন। তিনি মীর শওকত আলীকে যেকোনো মূল্যে আরও অন্তত দুদিন রামগড় মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন, যেন নিরীহ মানুষরা নিরাপদে ভারতে আশ্রয় নিতে পারেন।

পঞ্চগড়ে হানাদার হামলা

পঞ্চগড়ের অমরখানার কাছে মাগুরামারীতে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর ১০ জনের একটি দলের ওপর পাকিস্তানি হানাদাররা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং দুইজন গুরুতর আহত হন।

চট্টগ্রামের চিকনছড়ায় যুদ্ধ

চট্টগ্রামের চিকনছড়ায় অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর ওপর হানাদার বাহিনী অতর্কিত হামলা করে। অবস্থা বেগতিক দেখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে স্থানীয় এক বাগানবাড়িতে আশ্রয় নেন।

শান্তি কমিটির কার্যক্রম

রংপুরে শান্তিবাহিনীর মিছিল: রংপুরে শান্তিবাহিনীর উদ্যোগে এদিন শহরজুড়ে মিছিল বের হয়। মিছিলের নেতৃত্ব দেন জাতীয় পরিষদের সদস্য সিরাজুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আমিন।

সিলেটে শান্তি কমিটির ভাষণ

সিলেটে শান্তি কমিটির আহ্বায়ক নাজমুল হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার আবদুল জলিল সিলেট বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণ দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তারা মুক্তিবাহিনীকে "ভারতের চর" বলে আখ্যায়িত করেন।

খুলনায় শান্তি কমিটির সভা

খুলনার দৌলতপুরের দিয়ানায় শান্তিবাহিনীর আহ্বায়ক সবুর খানের সভাপতিত্বে শান্তি কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সবুর খান খুলনাবাসীকে দেশদ্রোহী মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "মুক্তিরা এদেশে অরাজকতা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আপনারা যদি আমাদের প্রাণপ্রিয় সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেন তাহলে মুক্তিরা দেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।"

সারসংক্ষেপ ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল বহুমাত্রিক তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। একদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীদের প্রতি সমর্থন জানান, অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রংপুর ও শেরপুরে নির্মম গণহত্যা চালায়। এই দিনে ঢাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ বিশেষ ঘোষণা দেয়, শান্তি কমিটিরা পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করে এবং মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন স্থানে বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যায়।

তথ্যসূত্র

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম খণ্ড

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা: ১ মে ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান: ১ মে ১৯৭১

রক্তে ভেজা একাত্তর: মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাউজানে থামছে না লাশের মিছিল: নেপথ্যে আধিপত্য ও বালুমহাল

নাফ নদী থেকে আরাকান আর্মির হাতে ৭ জেলে অপহৃত

৩০ এপ্রিল ১৯৭১: ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধে জয়ী হবেই’

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

শেখ জামাল: এক অকুতোভয় বীর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকার

নতুন সরকারের আড়াই মাসে ১ হাজার ১৩০টি হত্যা-ধর্ষণ মামলা

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরে শুরু হলো ইউরেনিয়াম লোডিং

১০

ফজলুর রহমানের মন্তব্যে তোলপাড় সংসদ / শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতের রাজনীতি করা অসম্ভব

১১

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

১২

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

১৩

পুলিশি বাধায় পিছু হটেননি সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা / নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি

১৪

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক মির্জা ফখরুলের

১৫

মুক্তিযুদ্ধের দলিলচিত্রের রূপকার কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

১৬

২৬ এপ্রিল ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল

১৭

ইউনূসের ১৮ মাস / অর্থনীতির গভীর ক্ষত ও এক ‘ফোকলা’ উত্তরাধিকারের খতিয়ান

১৮

তপ্ত জনপদে অন্ধকারের শাসন

১৯

জয়পুরহাটের পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যায় আজও আতঙ্কিত স্বজনহারা পরিবার

২০