

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের মানুষের প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। ‘থ্রি জিরো’র প্রবক্তা হিসেবে তাঁর বিশ্বজুড়ে পরিচিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে—এমনটাই ছিল সবার আশা। কিন্তু ১৮ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখন দেখা যাচ্ছে, সেই আশা ভেঙে চুরমার হয়েছে হাহাকারে। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নীতি-নির্ধারণী অদক্ষতা, ব্যবসা-বাণিজ্যকে অবজ্ঞা এবং বিতর্কিত সব চুক্তির ফলে ড. ইউনূস সরকার দেশকে এক ‘ফোকলা’ অর্থনীতির উত্তরাধিকার দিয়ে গেছে।
অর্থনীতির বেহাল দশা: তথ্যে ও বাস্তবতায়
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৮ মাসে সামষ্টিক অর্থনীতিতে নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটেছে।
খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন: ২০২৪ সালের জুন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২.১১ লাখ কোটি টাকা। অথচ ২০২৫ সালের জুন নাগাদ তা ৫.৩০ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫১ শতাংশ।
বিদেশি ঋণের বোঝা: সরকারের পতনের সময় বিদেশি ঋণ ছিল ১০৩.৪১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের শেষে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
সুদের হার ও বিনিয়োগ খরা: নীতি সুদহার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যার ফলে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।
মূল্যস্ফীতি: উচ্চ মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে নেমেছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে ব্যবসায় বড় ধস নেমেছে।
ব্যবসায়ীদের অবজ্ঞা ও অদূরদর্শিতা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান ও সিনিয়র ব্যাংকার মামুন রশীদের মতো বিশ্লেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো এনগেজমেন্টেই যায়নি। শীর্ষ উদ্যোক্তারা বারবার সময় চাইলেও প্রধান উপদেষ্টার দেখা পাননি। জুলাই-পরবর্তী সময়ে শিল্পাঞ্চলে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছিল, তা সামাল দিতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল। বিদেশি ক্রেতারা নিরাপত্তার অভাবে বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় নিয়ে গেছেন।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ: এক আত্মঘাতী পরিকল্পনা
জ্বালানি খাতে সরকার কোনো আপৎকালীন মজুদ অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন মনে করেনি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়ার আগেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় এখন সার কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। গ্রামে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের কাজকে অগ্রাধিকার না দিয়ে প্রকল্প বিলম্বিত করা হয়েছে, যা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বাধা সৃষ্টি করেছে।
বিতর্কিত চুক্তি: সার্বভৌমত্ব ও রাজস্বের ওপর আঘাত
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বেশ কিছু বিতর্কিত বিদেশি চুক্তি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ফেলেছে:
১. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’: এই চুক্তির আওতায় ২১.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য (বোয়িং বিমান, এলএনজি, গম) কেনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার শর্তে বাংলাদেশকে ১৯ শতাংশ শুল্ক দেওয়ার বোঝা নিতে হয়েছে, যেখানে আগে শুল্ক হার ছিল কম। অন্যদিকে, ৪,৪০০ পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় রাজস্ব আয়ে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
২. চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ: বন্দর পরিচালনায় বিদেশি কম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার ফলে লাভের একটি বিশাল অংশ রাষ্ট্রের হাতছাড়া হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, দেশের লাইফলাইন এই বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং এটি সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে যতটা ‘দৌড়ঝাঁপ’ করেছে, অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ফেরাতে তার চেয়ে অনেক কম মনোযোগ দিয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা এবং ভুল নীতি-নির্ধারণের ফলে যে ‘শূন্য তহবিল’ ও ‘ঋণের বোঝা’ রেখে যাওয়া হয়েছে, তা বর্তমান সরকারের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। ১৮ মাস শেষে দেশ এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে এক দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতার খাঁচায় বন্দি।
মন্তব্য করুন