ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২১ এপ্রিল ১৯৭১: শ্রীঅঙ্গনে নারকীয় গণহত্যা ও ভাসানীর কূটনৈতিক উদ্যোগ

মওলানা ভাসানীর কূটনৈতিক উদ্যোগ, শ্রীঅঙ্গন ও পঞ্চগড় গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের পরিস্থিতি
প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম
২১ এপ্রিল ১৯৭১: শ্রীঅঙ্গনে নারকীয় গণহত্যা ও ভাসানীর কূটনৈতিক উদ্যোগ

একাত্তরের রণাঙ্গনে ২১ এপ্রিল ছিল এক চরম বৈপরীত্যের দিন। একদিকে বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলাদেশের গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কূটনৈতিক আর্তনাদ ও প্রবাসী সরকারের আন্তর্জাতিক তৎপরতা; অন্যদিকে ফরিদপুরের শ্রীঅঙ্গন মঠের নিরস্ত্র সন্ন্যাসীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা ও পঞ্চগড় দখলের পৈশাচিক চিত্র। এই দিনটি একদিকে যেমন ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের, অন্যদিকে ছিল স্বাধীনতার স্বপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের প্রয়াসের।

বিশ্বনেতাদের কাছে মওলানা ভাসানীর আবেদন

২১ এপ্রিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশের এক মুক্তাঞ্চল থেকে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়কদের কাছে জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট, গণচীনের প্রেসিডেন্ট মাও সে তুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন লাই, সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ, চেয়ারম্যান কোসিগিন ও প্রধানমন্ত্রী পদগর্নি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পম্পিডো, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, আরব লীগের মহাসচিব আবদেল খালেক হাসুনা এবং আরব ঐক্য সংস্থার মহাসচিব দায়লো টেলির কাছে পৃথক চিঠি লেখেন।

তিনি তাঁর বার্তায় অবিলম্বে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগের আবেদন জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর উচিত সামরিক বাহিনীর এই বর্বরতা স্বচক্ষে দেখার জন্য নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল পাঠানো।

একই দিনে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক ছিল।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া:

সমর্থন: লন্ডনের আইরিশ শ্রমিক দলের কর্মকর্তা ড. কোনার ক্রুইজ এই সামরিক অভিযানকে “সাম্রাজ্যবাদী ও দমনমূলক যুদ্ধ” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

বিপরীতমুখী অবস্থান: অন্যদিকে, আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পাক বাহিনীর অভিযানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

শ্রীঅঙ্গন ও পঞ্চগড়ে নারকীয় গণহত্যা

২১ এপ্রিল ফরিদপুরের গোয়ালন্দঘাট দখলের পর পাকিস্তানি হানাদাররা ফরিদপুর শহরে প্রবেশ করে। শহরের শ্রীঅঙ্গন মঠে তখন কীর্তন চলছিল। প্রাণভয়ে অনেকে পালিয়ে গেলেও ৯ জন সন্ন্যাসী আশ্রম ছাড়েননি। ক্যাপ্টেন জামশেদের নেতৃত্বে বিহারী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা তাদের "বাহার মে আও" (বাইরে এসো) বলে নির্দেশ দিলেও সন্ন্যাসীরা কীর্তন চালিয়ে যান। তারা গেয়েছিলেন, "জয় জগৎবন্ধু হরি! জয় জয় জগৎবন্ধু হরি।"

বিহারীরা পাকিস্তানি বাহিনীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বলে, সন্ন্যাসীরা নাকি "জয় বঙ্গবন্ধু" বলে চিৎকার করছেন। এই মিথ্যা অভিযোগে হানাদাররা ৮ জন সন্ন্যাসীকে মন্দিরের পাশে চালতা গাছের নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ১২ রাউন্ড গুলি চালিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। নবকুমার ব্রহ্মচারী নামের এক সন্ন্যাসী সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান। হত্যার পর মূল্যবান সম্পদ লুট করা হয় এবং ২৬ এপ্রিল ডায়নামাইট দিয়ে এই ঐতিহাসিক মঠের শিখর ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

একই দিনে পঞ্চগড় শহর দখল করে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। মহানন্দা নদীর পাড়ে অনেক মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং পুরো পঞ্চগড় বাজার পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

রণাঙ্গনের পরিস্থিতি

দেশের বিভিন্ন স্থানে এদিন তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে:

যশোর: নাভারন ঘাঁটিতে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে ১০ পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ১০ জন আহত হয়।

হিলি ও কিশোরগঞ্জ: তীব্র লড়াইয়ের পর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে হিলি ও কিশোরগঞ্জ প্রতিরক্ষা ঘাঁটির পতন ঘটে।

কুমিল্লা: মেজর ইমামুজ্জামানের নেতৃত্বে বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সৈন্য লাকসাম ত্যাগ করে মিয়ার বাজারে অবস্থান নেয়।

ঢাকায় শান্তি কমিটির অপতৎপরতা

ঢাকায় মুসলিম লীগ নেতা খান এ. সবুর এক বিবৃতিতে ‘ভিজিলেন্স কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি একে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জরুরি কর্তব্য হিসেবে আখ্যা দেন।

একাত্তরের দিনলিপি: জাহানারা ইমামের বয়ানে

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের দিনলিপিতে এদিন ফুটে ওঠে এক মায়ের মানসিক দহন। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রুমীর যুদ্ধে যাওয়ার জেদ ও মায়ের অসহায়ত্বের কথা লিখেছিলেন। রুমী তাঁর মা-কে বলেছিল, "আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে।" ছেলের এই দেশপ্রেম ও জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মেনে মা বলেছিলেন, "দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা।"

২১ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল এক বেদনাবিধুর দিন। শ্রীঅঙ্গনের সন্ন্যাসীদের কীর্তনরত অবস্থায় হত্যা করা ছিল এক অবর্ণনীয় পৈশাচিকতা। আবার রুমীর মতো তরুণদের যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল এক অমিত সাহসের প্রতীক। মওলানা ভাসানীর চিঠি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন নেতৃত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বৈশ্বিক মঞ্চেও বাংলাদেশকে স্বাধীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (অষ্টম, নবম ও দ্বাদশ খণ্ড)।

২. একাত্তরের দিনগুলি — জাহানারা ইমাম।

৩. মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর — আবু সাইদ খান।

৪. ৭১ এর দশ মাস — রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী।

৫. দৈনিক পাকিস্তান (২২ এপ্রিল, ১৯৭১)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২১ এপ্রিল ১৯৭১: শ্রীঅঙ্গনে নারকীয় গণহত্যা ও ভাসানীর কূটনৈতিক উদ্যোগ

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধাক্কা

কাঁচামাল সংকট: বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানা

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ: রণাঙ্গনের অকুতোভয় মহানায়ক

২০ এপ্রিল ১৯৭১: বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের আত্মত্যাগ ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের দিন

নীতি-ভুলের খেসারত / মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৩০ লাখ শিশু, ফিরছে নির্মূল হওয়া রোগ

১৯ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী সরকারের শাসনতান্ত্রিক নির্দেশনা ও রণক্ষেত্রে রক্তের দাগ

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও মুজিবনগর সরকার

মুজিবনগর দিবস: এক অমর ইতিহাসের মহাকাব্য

১০

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

১১

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১২

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

১৩

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

১৪

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১৫

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১৬

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১৭

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

১৮

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৯

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

২০