ঢাকা রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি একই সঙ্গে গৌরব ও চরম শোকের বার্তা বহন করে। একদিকে এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মন্ত্রিসভা ও সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড কাঠামো ঘোষিত হয়, অন্যদিকে নীলফামারীর সৈয়দপুরে সংগঠিত হয় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ‘বালারখাইল গণহত্যা’।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা ঘোষণা

১২ এপ্রিল রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় বাংলাদেশের প্রথম সরকারের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার নাম ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।

রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

উপ-রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান)।

প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ।

মন্ত্রিসভার সদস্য: খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

একই দিনে রণাঙ্গনকে সুশৃঙ্খল করতে কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (C-in-C) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

বালারখাইল গণহত্যা: বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম নীলনকশা

ঢাকার রায়েরবাজার বধ্যভূমির অনেক আগেই পাকিস্তানি বাহিনী নীলফামারীর সৈয়দপুরে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার সূত্রপাত ঘটায়। ২৫ মার্চ থেকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি থাকা প্রায় ১৫০ জন বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে টানা ১৮ দিন অমানুষিক নির্যাতনের পর ১২ এপ্রিল মধ্যরাতে রংপুর সেনানিবাসের নিকটবর্তী নিসবেতগঞ্জের ‘বালারখাইল’ নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জিকরুল হক, ডা. শামসুল হক, ডা. বদিউজ্জামান এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ তুলসীরাম আগরওয়ালাসহ প্রায় দেড়শ জন গুণী মানুষকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বিহারি কাইয়ুমের নির্দেশে সংগঠিত এই হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল সৈয়দপুর শহরকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেওয়া। সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কমলা প্রসাদের সাক্ষ্য থেকে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়।

ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১২ এপ্রিল ঢাকায় প্রথম বড় ধরনের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মিছিল বের হয়। গোলাম আযমের নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররম থেকে বের হওয়া এই মিছিলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দেওয়া হয় এবং হানাদার বাহিনীর সাফল্য কামনা করে মোনাজাত করা হয়।

অন্যদিকে, ঢাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে বিখ্যাত ‘টাইম’ (Time) ম্যাগাজিন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ঢাকার ধ্বংসলীলা আক্ষরিক অর্থেই এক রক্তস্নান, যা চেঙ্গিস খানের নৃশংসতাকেও হার মানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৯ জন বিশিষ্ট নাগরিকও এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে সামরিক বল প্রয়োগ বন্ধের দাবি জানিয়ে বার্তা পাঠান।

রণাঙ্গনের চিত্র: আক্রমণ ও প্রতিরোধ

এদিন সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন:

উত্তরবঙ্গ: লালমনিরহাট বিমানবন্দরে সুবেদার আরব আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকঘাঁটিতে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। রাজশাহীর নাটোরে তুমুল আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা বানেশ্বরে অবস্থান নেয়।

রাজশাহী ও ঈশ্বরদী: নায়েক সুবেদার লস্কর সিরাজউদ্দীন ও ক্যাপ্টেন গিয়াসের নেতৃত্বে পাবনার নগরবাড়ীতে পাকবাহিনীর গতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়। পুঠিয়ার বিড়ালদহে ৭ ঘণ্টার যুদ্ধে ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

দক্ষিণাঞ্চল: যশোরের ঝিকরগাছায় ইপিআর ও বিএসএফ-এর যৌথ প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানিরা আর্টিলারি হামলা চালায়। এতে ইপিআর-এর দুজন ও বিএসএফ-এর একজন সদস্য শহীদ হন।

চট্টগ্রাম: ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের সদস্যরা কালুরঘাট থেকে পিছু হটে রাঙামাটির মহালছড়িতে নতুন হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে।

সামরিক কর্তৃপক্ষের আল্টিমেটাম

ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ এদিন এক ফরমান জারির মাধ্যমে সব সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মচারীকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। অন্যথায় তাদের বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়া হয়। একই সময় মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর বেতার ভাষণে মুক্তিযোদ্ধাদের বিন্দুমাত্র দয়া না দেখিয়ে হত্যার আহ্বান জানান।

১২ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল একদিকে জাতির প্রশাসনিক ভিত্তি মজবুত করার দিন, অন্যদিকে মেধাবী সন্তানদের হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার দিন। বালারখাইলের রক্ত আর স্বাধীন সরকারের শপথ—এই দুইয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার চূড়ান্ত বিজয়ের পথে ধাবিত হতে শুরু করে।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র (ত্রয়োদশ খণ্ড)।

২. বালারখাইল গণহত্যা — আহম্মেদ শরীফ।

৩. দৈনিক পাকিস্তান ও আনন্দবাজার পত্রিকা (১৩ এপ্রিল ১৯৭১)।

৪. সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ২, ৭ ও ৮)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

কক্সবাজারে হামের ভয়াবহ রূপ / ২০ বেডে ৮৭ শিশু

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ / গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না

৩ বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা: সিলেটে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

দ্য প্রাইম মিনিস্টার-এ ফ্যামিলি ম্যান!

পেস ত্রয়ীকে বিশ্রাম দিয়ে তরুণ দল পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

লক্ষ্য বড় চুক্তি / বাণিজ্য যুদ্ধ ও ইরান উত্তাপের মধ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন ট্রাম্প

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ / মৃত্যু ছাড়াল ৪০০, একদিনে ঝরল ১১ প্রাণ

১১ মে ১৯৭১: আর্তমানবতার পক্ষে কেনেডির গর্জন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

মঙ্গল শোভাযাত্রা—বিশ্বমঞ্চে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

১০

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

১১

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

১২

অবশেষে হামে ধরা খেলেন সওদাগর!

১৩

৩৬০ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মেঘনা-ফুলদী তীর

১৪

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: শর্তের বেড়াজালে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সংকট

১৫

৯ মে ১৯৭১: আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ ও পাক-হানাদারের নির্মমতা

১৬

সবাই তো এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!

১৭

ইউনূস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির আদ্যোপান্ত, পড়ুন পুরো চুক্তিটি

১৮

সবার আগে দেশ, তার আগে আমেরিকা

১৯

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট

২০