
বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত ও বেদনাবিধুর অধ্যায় ‘২৫শে মার্চ কালরাত্রি’ স্মরণে এবং একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিচারের দাবিতে এক বিশেষ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ‘মার্চ একাত্তর স্মরণে সম্মিলিত আয়োজন ২০২৬’। আগামী ২৫ মার্চ বুধবার, সন্ধ্যা সাতটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে জগন্নাথ হলের গণকবর পর্যন্ত এক বিশাল ‘আলোর মিছিল’ (মোমবাতি মিছিল) অনুষ্ঠিত হবে।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, ২৫ মার্চ বিকেলের পর থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে কর্মসূচি শুরু হবে। এতে অংশ নেবেন দেশের প্রথিতযশা চারুশিল্পীরা, যারা তুলির আঁচড়ে একাত্তরের ভয়াবহতা ও মুক্তিকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলবেন। এরপর গণসংগীত ও কবিতা পাঠের মাধ্যমে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে প্রদর্শিত হবে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’।
মূল কর্মসূচি ‘আলোর মিছিল’ শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়। শহীদ মিনার থেকে যাত্রা শুরু করে মিছিলটি ২৫শে মার্চের গণহত্যার অন্যতম সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের গণকবরে গিয়ে শেষ হবে। আয়োজকরা দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও বয়স নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফিরে দেখা ২৫শে মার্চ ১৯৭১: এক নারকীয় অধ্যায়
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে কাপুরুষোচিত ও বর্বর অভিযান শুরু করেছিল, তার সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
শিক্ষাঙ্গনে হামলা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের মূল লক্ষ্যবস্তু। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) এবং শিক্ষকদের আবাসস্থলে ট্যাংক ও মেশিনগানের গুলিতে কয়েক শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হলে নিহতদের প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্র।
রাজারবাগ ও পিলখানা: পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানার ইপিআর সদর দপ্তরে। তবে ভারী অস্ত্রের মুখে অকাতরে প্রাণ দেন পুলিশ ও পিলখানার সাহসী বাঙালি জওয়ানরা।
নির্বিচার গণহত্যা: ঢাকার সাধারণ বস্তিবাসী ও রাস্তায় থাকা মানুষের ওপরও চলে নির্মম নিধনযজ্ঞ। এক রাতেই ঢাকার রাজপথ রক্তাক্ত লাশে ঢেকে যায়। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এর তথ্যমতে, ওই এক রাতেই প্রায় ১ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক দলিল: তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড একে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে গবেষক আর. জে. রুমেল-এর মতে, এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও দ্রুততম গণহত্যা।
দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের গণহত্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আজও পূর্ণতা পায়নি। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন। ‘মার্চ একাত্তর স্মরণে সম্মিলিত আয়োজন’ মনে করে, ২৫শে মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায় এবং এর নেপথ্যে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করাই হোক এবারের কালরাত্রির মূল শপথ।
মন্তব্য করুন