ঢাকা মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

রক্তস্নাত বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
বুরুঙ্গা গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ | ছবি: আহমাদ ইশতিয়াক

পটভূমি ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বুড়ি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত বুরুঙ্গা গ্রাম। ১৯৭১ সালে এই গ্রামটি ছিল হিন্দুপ্রধান অঞ্চল। প্রত্যন্ত ও ভৌগোলিক বিচারে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করায় মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে সিলেট ও তার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু বিপন্ন মানুষ জীবন বাঁচাতে বুরুঙ্গা গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

২৫ মে ১৯৭১, দুপুরের দিকে বুরুঙ্গা ও এর পার্শ্ববর্তী গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগমনবার্তা পৌঁছালে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিকেল ৪টার দিকে গ্রামবাসীরা আশ্বাসের খোঁজে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর সাথে দেখা করেন। ইনজাদ আলী তাদের আশ্বস্ত করেন এবং তার নির্দেশেই ওই দিন বিকেলে বুরুঙ্গা ও তার আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয় যে:

“আগামীকাল ২৬ মে সকাল ৮টায় বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি ‘শান্তি কমিটি’ গঠন করা হবে। সেখানে সবাইকে স্বাভাবিক চলাচলের জন্য ‘পিস কার্ড’ বা ‘পরিচয়পত্র’ বিতরণ করা হবে। পরিচয়পত্র থাকলে কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না।”

এক নজরে বুরুঙ্গা গণহত্যা

ঘটনার তারিখ

২৬ মে ১৯৭১, দুপুর ১২:০০ টা (আনুমানিক)

স্থান বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ (বর্তমান: বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ), ওসমানীনগর (তৎকালীন বালাগঞ্জ), সিলেট।
আক্রান্ত ব্যক্তি বুরুঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরীহ বাঙালি (প্রধানত হিন্দু ধর্মাবলম্বী)।
হত্যাকাণ্ডের ধরন এলএমজি (Light Machine Gun) ও ব্রাশফায়ার, অগ্নিসংযোগ এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসতা।
শহীদ সংখ্যা ৯৪ জন (কোনো কোনো উৎসে নিহতদের মধ্যে ৭১ থেকে ৭৮ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭২ জনকে বুরুঙ্গা গণকবরে সমাহিত করা হয়)।

ফাঁদ ও অবরুদ্ধকরণের নীলনকশা

চেয়ারম্যানের কথায় ও পরিচয়পত্র পাওয়ার আশায় নিরীহ গ্রামবাসীদের ভয় কিছুটা কাটে। ২৬ মে সকাল ৮টার পর থেকে বুরুঙ্গা এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর পুরুষেরা একে একে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে সমবেত হতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠটি প্রায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় কুখ্যাত দালাল ও রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরী (ওরফে ছাদ মিয়া), ডা. আব্দুল খালিক এবং পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন খানের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনা জিপ ও ট্রাকে করে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হয়। রাজাকাররা পূর্বপ্রস্তুত তালিকা মিলিয়ে উপস্থিতির হিসাব কষতে থাকে। একই সময়ে হানাদারদের আরেকটি দল আশপাশের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোনো পুরুষ লুকিয়ে আছে কি না তা তল্লাশি করে এবং সবাইকে মাঠে আসার নির্দেশ দেয়।

পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ও ব্রাশফায়ার

সকাল ১০টার দিকে পৈশাচিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। সমবেত জনতাকে ধর্মের ভিত্তিতে দু’টি ভাগে আলাদা করা হয়।

মুসলিমদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন: মুসলিমদের আলাদা করে বিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকের টিনশেড শ্রেণীকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাইতে এবং কালেমা পাঠ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হলেও একটি বর্বর শর্ত দেওয়া হয়।

হিন্দুদের অবরুদ্ধকরণ: মাঠের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে এবং বারান্দায় কড়া পাহারায় অবরুদ্ধ করা হয়। এরপর বাজার থেকে মোটা রশি এনে অবরুদ্ধ হিন্দুদের শক্ত করে বাঁধার নির্দেশ দেওয়া হয়। পৈশাচিকতার চরম রূপ হলো—ছেড়ে দেওয়ার আগে বন্দি মুসলিমদের ওপরই জোরপূর্বক দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের প্রতিবেশী হিন্দুদের চারগাছি দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলার। এ সময় ভয়ে ও আতঙ্কে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

পলায়নচেষ্টা ও প্রথম গুলি: বাঁধার সময় তীব্র আতঙ্কে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ-প্রধান শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন চৌধুরী এবং রানু মালাকার নামের এক তরুণ পেছনের একটি জানালা খুলে পালানোর চেষ্টা করলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

গণ-ব্রাশফায়ার (দুপুর ১২:০০ টা): দুপুর ১২টার দিকে ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন খানের চূড়ান্ত নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা বিদ্যালয়ের সামনের সবুজ চত্বরটি ঘিরে ফেলে কয়েকটি লাইট মেশিনগান (LMG) তাক করে। এরপর বন্দি হিন্দুদের ৩টি সারিতে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে পবিত্র শিক্ষাঙ্গনের সবুজ চত্বর রক্তের নদীতে পরিণত হয়। শত শত বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় নিরপরাধ মানুষের দেহ।

অলৌকিক বেঁচে যাওয়া ও অগ্নিকাণ্ডের দ্বিতীয় তাণ্ডব

ব্রাশফায়ার শেষে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। তবে অনেকেই বুলেটের আঘাত সহ্য করে লাশের স্তূপের নিচে মৃতের ভান করে নিস্পন্দ পড়েছিলেন (যার মধ্যে অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীনিবাস চক্রবর্তী)। হানাদাররা যখন চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখন আহতদের মধ্য থেকে একজন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সৃষ্টিকর্তার নাম উচ্চারণ করেন।

শব্দ শুনে হায়েনারা পুনরায় লাশের স্তূপ লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এরপরও তাদের নিষ্ঠুর তৃপ্তি না হওয়ায় বুরুঙ্গা বাজার থেকে দুই টিন কেরোসিন আনিয়ে স্তূপীকৃত লাশ এবং অর্ধমৃত মানুষদের ওপর ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয়ে অনেক আহত মানুষ জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যান।

আইনজীবী রামরঞ্জন ভট্টাচার্যকে হত্যা ও লুটপাট

এই বর্বরোতার মাঝেই এক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সিলেট জজ কোর্টের প্রখ্যাত ও প্রবীণ আইনজীবী রামরঞ্জন ভট্টাচার্য (যাঁর বয়স ছিল ৭০ বছরেরও বেশি) বুরুঙ্গায় তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁকেও ধরে এনে মাঠে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পুরো হত্যাকাণ্ড দেখার পর পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে চলে যাওয়ার অভিনয় করতে বলে। কিন্তু তিনি তাঁর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর আগেই ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিনের নির্দেশে পেছন থেকে মাথায় গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ড শেষ করে দুপুর ১টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর, কুখ্যাত রাজাকার আহাদ চৌধুরী এবং ডা. আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র রাজাকার পুরো বুরুঙ্গা গ্রামে ঢুকে হিন্দু পরিবারগুলোর পরিত্যক্ত ঘরবাড়িতে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। পাকবাহিনীর নির্দেশে তারা নারীদের ওপরও পাশবিক নির্যাতন চালায়।

উত্তরপ্রজন্ম ও স্মৃতি সংরক্ষণ

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই রক্তাক্ত চত্বর থেকে শহীদদের দেহাবশেষ ও কঙ্কাল সংগ্রহ করে বুড়ি নদীর তীরে সমাহিত করা হয়, যা আজ ‘বুরুঙ্গা গণকবর’ বা বধ্যভূমি নামে পরিচিত। নিহতদের মধ্যে ৭২ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। প্রতি বছর ২৬ মে এই নিভৃত পল্লীতে অত্যন্ত শোকাবহ পরিবেশে বুরুঙ্গা গণহত্যার শহীদদের স্মরণ করা হয়। এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পাকিস্তানি বর্বরতা ও ত্যাগের এক জ্বলন্ত দলিল।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: সপ্তম ও অষ্টম খণ্ড।

২. সংগ্রামের নোটবুক: ১৯৭১.০৫.২৬ | বুরুঙ্গা গণহত্যা (ওসমানীনগর, সিলেট)।

৩. উইকিপিডিয়া: বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট) এবং শহীদ রামরঞ্জন ভট্টাচার্য জীবনী।

৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টরের বিবরণী)।

৫. প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীনিবাস চক্রবর্তী ও প্রীতিরঞ্জন চৌধুরীর যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী জবানবন্দি।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রক্তস্নাত বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)

২৬ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, প্রতিরোধ ও বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গন

ভীমনালী গণহত্যা: যে নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত

২২ মে ১৯৭১: গণহত্যা, প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

১৬২ পয়েন্টে ১৬০০ গডফাদার: কার ইশারায় ঢুকছে মাদক?

হত্যা মামলায় রক্তাক্ত সাংবাদিকতা

১৮ মে ১৯৭১: পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক যুদ্ধ

জাতীয় জাদুঘর থেকে বঙ্গবন্ধু কর্নার উধাও: ইতিহাস বিকৃতির আশঙ্কা

হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

কক্সবাজারে হামের ভয়াবহ রূপ / ২০ বেডে ৮৭ শিশু

১০

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ / গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না

১১

৩ বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা: সিলেটে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

১২

দ্য প্রাইম মিনিস্টার-এ ফ্যামিলি ম্যান!

১৩

পেস ত্রয়ীকে বিশ্রাম দিয়ে তরুণ দল পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

১৪

লক্ষ্য বড় চুক্তি / বাণিজ্য যুদ্ধ ও ইরান উত্তাপের মধ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন ট্রাম্প

১৫

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ / মৃত্যু ছাড়াল ৪০০, একদিনে ঝরল ১১ প্রাণ

১৬

১১ মে ১৯৭১: আর্তমানবতার পক্ষে কেনেডির গর্জন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১৭

মঙ্গল শোভাযাত্রা—বিশ্বমঞ্চে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

১৮

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

১৯

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

২০