ঢাকা শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
২৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
২৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৪০ পিএম
২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার খবর বিশ্ববাসী মূলত জানতে পারে একাত্তর সালের ২৭ মার্চ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

২৫শে মার্চ রাতের গণহত্যায় ঢাকা পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপ আর লাশের নগরীতে। ২৭ মার্চ সকালেও বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে এনে রমনা কালীমন্দিরে ২৭ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। ধারণা করা হয়, সেখানে শহীদদের বেশিরভাগই বাঙালি ইপিআর সদস্য।

এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন শিথিল করে সামরিক কর্তৃপক্ষ।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিখেছেন, “…নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের সামনে পৌঁছেই রুমী হঠাৎ ‘ও গড!’ বলে ব্রেক কষে ফেলল। সামনেই পুরো কাঁচাবাজার পুড়ে ছাই হয়ে রয়েছে। এখনো কিছু কিছু ধোঁয়া উঠছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘মানুষও পুড়েছে। ওই সে পোড়া চালের ফাঁক দিয়ে…’ রুমী জোরে গাড়ি চালিয়ে-, ‘আম্মা তাকায়ো না ওদিকে’ বলে ডান দিকে মিরপুর রোডে মোড় নিল।”

“হাসপাতালের আউটডোরে গেটে ঢোকার আগে রুমী আরেকবার ‘ও গড!’ বলে ব্রেক কষে ফেলল। পাশেই শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলো গোলার আঘাতে ভেঙে দুমড়ে মুখ থুবড়ে রয়েছে। আমার দু’চোখ পানিতে ভরে গেল। একি করেছে ওরা!”

অসংখ্য মানুষকে হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই বেঁধে নিয়ে রিক্সায় বা পায়ে হেঁটে ঢাকা শহর ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। এদিনই বাঙালিদের আশ্রয় দিতে সীমান্ত খুলে দেয় ভারত। আকাশবাণীতে সীমান্ত খুলে দেওয়ার খবর জানার পর জনস্রোত ধাবিত হয় সীমান্ত অভিমুখে।

ঢাকায় টানা ৩৪ ঘণ্টার হত্যাকাণ্ড শেষে করে এদিন পাকিস্তানের সেনারা ব্যারাকে ফেরে। পাকিস্তানের কোনো খবরে বাংলাদেশের ওপর এই বর্বরতার কথা প্রকাশ হয়নি। আর ঢাকায় কোনো পত্রিকাই প্রকাশিত হয়নি।

২৭ মার্চ বিবিসির খবরে বলা হয়, “কলকাতা থেকে প্রচারিত সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ যে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক গুপ্ত বেতার থেকে জনসাধারণের কাছে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।”

ভয়েস অব আমেরিকার খবরে বলা হয়, “ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। মুজিবুর রহমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।”

দিল্লির দ্য স্টেটসম্যান-এর প্রতিবেদনে লেখা হয়, “বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে রহমানের পদক্ষেপ। একটি গোপন বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পূর্বাংশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নতুন নামকরণ করেছেন।”

দ্য গার্ডিয়ানের ২৭ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, “... ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে রেডিওতে ভাষণ দেয়ার পরপরই দ্য ভয়েস অব বাংলাদেশ নামে একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। তার এই ঘোষণা অপর এক ব্যক্তি পাঠ করেন।”

এছাড়া ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, হংকং, নরওয়ে, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর প্রচার করা হয় এদিন।আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস হেরাল্ডের ২৭ মার্চের সংখ্যার একটি খবরের শিরোনাম ছিল, "বেঙ্গলি ইনডিপেনডেন্স ডিক্লার্ড বাই মুজিব।”

নিউ ইয়র্ক টাইমসেও শেখ মুজিব এবং ইয়াহিয়ার ছবি ছাপানো হয়। শিরোনাম লেখা হয় "স্বাধীনতা ঘোষণার পরই শেখ মুজিব আটক।”

বার্তা সংস্থা এপি লেখে, “ইয়াহিয়া খান আবার সামরিক শাসন জারি করায় এবং আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।”

আয়ারল্যান্ডের দ্য আইরিশ টাইমসের শিরোনাম ছিল- ‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা’, সাথে ছিল শেখ মুজিবের ছবি।

ব্যাংকক পোস্টের খবরে বলা হয়, "শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।"

এদিন ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদের জোর করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করিয়ে নেওয়ার পর বাঙালি শ্রমিকদের হত্যা করা হয়।

তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী ‘৭১ এর দশমাস’, বিবিসি, জাহানারা ইমাম ‘একাত্তরের দিনগুলি’

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১০

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১১

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১২

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৩

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৪

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৫

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৬

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

১৭

অস্থির ডলার, চাপে টাকা / মধ্যপ্রাচ্যের রণসংঘাতের ছায়া বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে

১৮

১৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার নীলনকশা নিয়ে ঢাকায় ইয়াহিয়া, কালো পতাকায় উত্তাল বাংলা

১৯

১৪ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর হাতে বাংলার শাসনভার ও ঐতিহাসিক ৩৫ দফা

২০