
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকায় নৃশংস গণহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গোটা দেশ জ্বলে ওঠে। এর মাত্র চার দিনের মাথায়, ২৯ মার্চ, সেই আগুন যেন আরও বিস্তৃত হয়—একদিকে বাঙালি প্রতিরোধ যোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবেলা করছে, অন্যদিকে হানাদাররা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এটি ছিল সংগ্রাম ও বেদনার এক অবিস্মরণীয় দিন।
প্রতিরোধের আগুন চারদিকে
সারাদেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠছিল, তখন ২৯ মার্চ ছিল সে লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। কেরানীগঞ্জে বিচ্ছিন্নভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে । বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও সিলেট এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাকিস্তানি বিমান বাহিনী বিমান হামলা চালায়, যাতে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তবে সন্ধ্যায় মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশে পাক বাহিনীর একটি দল নিহত হয় । মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ভৈরব ও নরসিংদীর মধ্যকার রেললাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা হানাদারদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুতর ব্যাঘাত ঘটায় ।
চুয়াডাঙ্গায় অবস্থানরত মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে ইপিআর, আনসার, ছাত্র ও জনতার সম্মিলিত বাহিনী কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর হামলা চালায়। পাকিস্তানি বাহিনী মর্টার ও মেশিনগান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালালেও মুক্তি বাহিনী তিনভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ চালিয়ে সফল হয় ।
পাবনা থেকে গোপালপুরের পথে মুক্তিযোদ্ধাদের সফল অভিযানে ৪০ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। জীবিতদের অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে রাজশাহীর দিকে যাওয়ার পথে প্রাণ হারায় । চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী সেনানিবাসের বাইরে এসে মেডিকেল কলেজ ও নিকটবর্তী পাহাড়ে সমবেত হলে সন্ধ্যায় তারা প্রথম আক্রমণ চালায়, কিন্তু মুক্তিবাহিনী তা ব্যর্থ করে দেয় ।
সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ ও শপথ অনুষ্ঠান
এই দিনটি ছিল বাঙালি সেনাদের বিদ্রোহের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ময়মনসিংহে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল ব্যাটালিয়নের অফিসার ও সৈনিকদের টাউন হলে একত্রিত করে বাংলাদেশের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মেজর কে এম সফিউল্লাহ । এটি কার্যত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভিতর বাঙালি সেনাদের পৃথক সত্ত্বার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল।
বঙ্গবন্ধুকে করাচিতে নেওয়া
২৯ মার্চ সন্ধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ঢাকা সেনানিবাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হেলিকপ্টারে করে তেজগাঁও বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয় এবং রাতে সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে তাঁকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে বঙ্গবন্ধুর সহচর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা থেকে ফরিদপুর পৌঁছান, যেখানে পরে তিনি মুজিবনগর সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ।
স্বাধীন বাংলা বেতারের নতুন রূপ
এদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম থেকে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়, এবং এটি ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ নামে পরিচিতি পায় । এদিন কেন্দ্রটি থেকে তিন বেলায় তিনটি অধিবেশন প্রচার করা হয়। এটি মুক্তিকামী জনতার কাছে এক শক্তির উৎস, এক বাতিঘরের রূপ নেয় ।
নিরপরাধ প্রাণের বিনিময়
প্রতিরোধের পাশাপাশি ২৯ মার্চ ছিল নৃশংস হত্যাকাণ্ডেরও দিন। ২৯ মার্চ রাতে ঢাকায় প্রায় একশ’ বাঙালি ইপিআর সদস্যকে পাকিস্তানি সেনারা প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে তিনটি দলে ভাগ করে রমনা কালীবাড়ির কাছে নৃশংসভাবে হত্যা করে ।
এদিন রাত দেড়টার দিকে আরও এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পাকিস্তান আইনসভায় সর্বপ্রথম বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপনকারী বর্ষীয়ান আইনজীবী ও আইনসভার সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কুমিল্লার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা । তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে আর কখনো পাওয়া যায়নি ।
ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আরমা দত্ত সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, ২৮ মার্চ দাদু তাঁদের বলেছিলেন, “ওরা আজ রাতে আমাকে নিতে আসবে।” আর সেটাই ঘটে। রাত দেড়টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা বাড়িতে হানা দেয় । সেনাদের হাতে ধৃত হয়ে ক্যান্টনমেন্টে নেওয়ার পর আর ফিরে আসেননি ধীরেন্দ্রনাথ ও তার ছোট ছেলে দিলীপ ।
কারফিউ প্রত্যাহার ও চেকপোস্ট
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ২৯ মার্চ সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হয় । হানাদার বাহিনী এ সুযোগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ার চেষ্টারত মানুষের ঢল তখনও থামেনি। শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে সেনাবাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে পথচারীদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করে । অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘তখন সবার মনে হচ্ছিল ঢাকা থেকে বের হতে পারলেই নিরাপদ’ ।
তবে এই কারফিউ প্রত্যাহারের সুযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ-সহ অনেক নেতা-কর্মী। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনিই কার্যত স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন ।
২৯ মার্চের ঘটনাগুলো দেখায়, একদিকে বাঙালি জাতি কীভাবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, অন্যদিকে তারা কী নৃশংস নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই দিনটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ ও বর্বরতার এক করুণ মিলনক্ষেত্র।
তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী ‘৭১ এর দশমাস’, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র; উইকিপিডিয়া ; ভয়েস অফ আমেরিকা বাংলা ; প্রথম আলো ; বণিক বার্তা।
মন্তব্য করুন