ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছিল। একদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর অমানবিক গণহত্যা এবং প্রশাসনিক দমন-পীড়নের নগ্ন রূপ, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধ—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল ইতিহাসজুড়ে এক উত্তাল অধ্যায়।

প্রশাসনিক দমন-পীড়ন ও সামরিক কৌশল

ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক প্রশাসন এদিন বাঙালির ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও তীব্র করার জন্য নতুন নতুন ফরমান জারি করে।

ইপিআরের নাম পরিবর্তন: পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘পূর্ব পাকিস্তান বেসামরিক বাহিনী’ বা ইপিসিএফ (East Pakistan Civil Force)। এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি প্রহসনমূলক কৌশল।

সামরিক বিধি ১৪৮: পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ ‘১৪৮ নম্বর সামরিক বিধি’ জারি করে। এই আদেশের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধে চরম শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যে কাউকে মৃত্যুদণ্ডসহ চরম শাস্তি দেওয়ার লাইসেন্স দেওয়া হয় ঘাতকদের। এর ফলে দালালরা অবাধে নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পায়।

বিমান হামলা পরিকল্পনা: পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ. রহিম খান এদিন ঢাকায় আগমন করেন। ঢাকা থেকেই তিনি বিমান হামলার কৌশল ও অপারেশনাল পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করেন।

বিশ্ব গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

২৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ওপর চলা পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষোভ: যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ সচিব স্যার অ্যালেক ডগলাস হোম পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তির বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এদিকে, ব্রিটিশ এমপি জন স্টোনহাউজ লন্ডনে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “পূর্ব বাংলায় যে মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর গণহত্যা চলছে, তা অবিশ্বাস্য। ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করা হচ্ছে... এটি নিঃসন্দেহে গণহত্যা।”

ডেইলি মিররের কড়া সমালোচনা: ব্রিটিশ এমপি উড্রো ওয়াট ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকায় এক উপ-সম্পাদকীয়তে বিশ্বের নীরবতার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদকারী ও শান্তিবাদীদের নীরবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানে চলমান গণহত্যা পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বিপজ্জনক।”

সুইডেন ও নেপালের সমর্থন: সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আয়োজিত সম্মেলনে বুদ্ধিজীবীরা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে জাতিসংঘের মাধ্যমে গণহত্যার বিচারের দাবি জানান। নেপালের কাঠমান্ডুতেও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিক্ষোভ হয় এবং ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি সার্ভিস’-এর ন্যাশনাল কমিটি গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানায়।

ভারতের অবস্থান: ভারতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির নেতা এস এম যোশী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যদিকে, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম পাকিস্তানকে সতর্ক করে বলেন, ভারত কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না, তবে ভারতের ওপর আক্রমণ হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

গণহত্যা: রক্তের দাগে চিহ্নিত জলঢাকা ও চকরিয়া

২৭ এপ্রিল দখলদার বাহিনীর নৃশংসতায় নীলফামারী ও কক্সবাজারের মাটি ভিজেছিল মানুষের রক্তে।

কালীগঞ্জ গণহত্যা: নীলফামারীর জলঢাকার কালীগঞ্জ বাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৪০০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ ভারতে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায় এবং ব্রাশফায়ার করে তাদের শহীদ করে। আহতদের গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

চকরিয়া গণহত্যা: কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাকিস্তানি হানাদাররা হিন্দুপাড়ায় ঢুকে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। এতে বহু মানুষ শহীদ হন।

প্রতিরোধ ও রণাঙ্গনের লড়াই

সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধারা এদিন সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবিলা করেছেন।

ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরের আত্মত্যাগ: মহালছড়িতে মিজো গেরিলা ও পাকিস্তানি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা বেষ্টিত হয়ে পড়লে, ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীরত্বের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তার এই আত্মত্যাগের ফলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শত্রুর বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

অন্যান্য রণাঙ্গন: কুমিল্লার মিয়াবাজারে প্রচণ্ড লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শাহবাজপুরে লেফটেন্যান্ট মোরশেদের নেতৃত্বাধীন দল হানাদারদের ওপর সফল আক্রমণ চালায়। তবে প্রবল যুদ্ধের মুখে এদিন নোয়াখালী, সান্তাহার ও মৌলভীবাজার দখল করে নেয় হানাদার বাহিনী।

এদিন সীমান্ত দিয়ে অগণিত মানুষ প্রাণভয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় নতুন নতুন শরণার্থী শিবির খোলা হয়। ২৭ এপ্রিলের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুরতা যতই বাড়ছিল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় বাঙালির প্রতিরোধ ততই তীব্র হচ্ছিল।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, অষ্টম, নবম ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

২. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১।

৩. দৈনিক পাকিস্তান, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১।

৪. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১।

৫. বিবিসি এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্রের আর্কাইভ ফাইল (২৭ এপ্রিল ১৯৭১)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

২২ জুন ১৯৭১: নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পাকিস্তানে মার্কিন সমরাস্ত্রের চালান

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থবির

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এমপিপুত্র সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্ত

তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগস

২১ জুন ১৯৭১: রণাঙ্গনে প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুক্তরাজ্য ও ভারতের যৌথ বিবৃতি

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১০

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১১

১১ জুন ১৯৭১: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি

১২

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

১৩

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

১৪

৬ জুন ১৯৭১: অসাম্প্রদায়িকতার ডাক, রাজনৈতিক সমাধানের ৪ শর্ত

১৫

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক, কোন দেশে কত?

১৬

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

১৭

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

১৮

৪ জুন ১৯৭১: ছাতনীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক চাপ ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধ

১৯

৩ জুন ১৯৭১: জাতিসংঘে তোলপাড়, বিশ্ব জনমত গঠন ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত

২০