ঢাকা শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও মুজিবনগর সরকার

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সম্মাননা নিচ্ছেন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। বাঙালি জাতির সহস্র বছরের ইতিহাসে এক অবিনাশী গৌরবগাথার দিন। এদিন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বৈদ্যনাথতলার নিভৃত এক আম্রকাননে রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই দিনে তা একটি সুশৃঙ্খল ও বৈধ সরকার গঠনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

শপথ অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট ও নামকরণ

সকাল ১১টা। চারদিকে দেশি-বিদেশি অসংখ্য সাংবাদিক, হাজার হাজার স্থানীয় জনতা এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়। মেহেরপুর তখন একটি মুক্তাঞ্চল। এই ঐতিহাসিক ক্ষণেই বৈদ্যনাথতলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মুজিবনগর’। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের হুইপ আব্দুল মান্নান। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।

শপথ গ্রহণ ও মন্ত্রিসভা গঠন

আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী এদিন ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন। এরপর গঠিত হয় প্রথম মন্ত্রিসভা:

রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে বন্দি থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেন উপ-রাষ্ট্রপতি)।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ।

মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ: ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ।

মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি: কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী।

চিফ অব স্টাফ: লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম আব্দুর রব।

গার্ড অব অনার ও জাতীয় সংগীত

শপথ গ্রহণ শেষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে মুক্তিবাহিনীর দুটি প্লাটুন সামরিক কায়দায় অভিবাদন বা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। এরপর সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত— ‘আমার সোনার বাংলা’। এটি ছিল বিদেশের মাটিতে নয়, বরং বাংলাদেশেরই মুক্ত মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাকে প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভিবাদন।

নেতৃবৃন্দের ভাষণ: বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান

সৈয়দ নজরুল ইসলাম: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “পৃথিবীর মানচিত্রে আজ নতুন যে রাষ্ট্রটির সূচনা হলো, পৃথিবীর কোনো শক্তি তা মুছে ফেলতে পারবে না।” তিনি বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্ববাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।

তাজউদ্দীন আহমদ: প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি ঘোষণা করেন:

“অখণ্ড পাকিস্তান আজ মৃত। অসংখ্য মানুষের লাশের নিচে অখণ্ড পাকিস্তানের কবর রচিত হয়েছে। রাজনীতি ও মানবতার স্বার্থে ইয়াহিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা বিশ্বের দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতসহ যে দেশগুলো বাঙালির এই চরম সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছে, বাঙালি জাতি তাদের কাছে চিরঋণী থাকবে। একইসাথে তিনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের প্রতিও নৈতিক সমর্থনের আহ্বান জানান।

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য

১৭ এপ্রিলের এই শপথ গ্রহণ কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বৈধতা নিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার।

১. সাংগঠনিক রূপ: বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এই দিনেই সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি পায়। ২. গণপরিষদের ম্যান্ডেট: ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত এই সরকার প্রমাণ করেছিল যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত আন্দোলন। ৩. বিজয় ত্বরান্বিত করা: এই সরকার গঠনের ফলেই বিশ্ববাসী একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় যোগাযোগ ও সাহায্য প্রেরণের সুযোগ পায়, যা ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।

১৭ এপ্রিলের সূর্যোদয় ছিল বাঙালির মুক্তির বার্তা। মেহেরপুরের সেই আম্রকানন থেকে যে শপথ ধ্বনিত হয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। মুজিবনগর সরকারই ছিল আমাদের প্রথম দায়িত্বশীল সরকার, যারা এক কোটি শরণার্থীর ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সম্মুখ সমরের নেতৃত্ব দিয়ে লাল-সবুজের পতাকাকে ছিনিয়ে এনেছিল।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বিতীয় ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

২. মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম।

৩. প্রথম আলো ডেস্ক প্রতিবেদন: ১৭ এপ্রিল ২০২১।

৪. আনন্দবাজার পত্রিকা ও দৈনিক পাকিস্তান আর্কাইভ: এপ্রিল ১৯৭১।

৫. সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস: সেক্টর ৮ (কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর অঞ্চল)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও মুজিবনগর সরকার

মুজিবনগর দিবস: এক অমর ইতিহাসের মহাকাব্য

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

১১

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১২

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১৩

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১৪

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১৫

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১৬

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১৭

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৮

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৯

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

২০