ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

এস এম কামরুজ্জামান সাগর
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ১০ এপ্রিল এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা বিশ্ববাসীর কাছে ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে সমধিক পরিচিত। একই দিনে অনুমোদিত হয়েছিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ (Proclamation of Independence), যা কার্যত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান এবং একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের ‘জন্মসনদ’।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই ঐতিহাসিক তাগিদ থেকেই তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সমবেত হন এবং একটি বৈধ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আগরতলায় এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে এই সরকার গঠিত হয়। সরকারের প্রধান ব্যক্তিরা ছিলেন:

রাষ্ট্রপতি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে বন্দি থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হয়)।

উপ-রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ।

পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী: খন্দকার মোশতাক আহমদ (যিনি পরবর্তী সময়ে দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিলেন)।

অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী: এম মনসুর আলী।

স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী: এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

১০ এপ্রিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ অনুমোদন। এটি কোনো সাধারণ দলিল ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার ছিল। এর মূল দিকগুলো হলো:

১. আইনি ধারাবাহিকতা: এটি ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত গণপরিষদের মাধ্যমে আইনি রূপ পেল।

২. রাষ্ট্রীয় মূলনীতি: এই দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, নতুন এই রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা করা।

৩. প্রশাসনিক ভিত্তি: যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচিত না হচ্ছে, ততক্ষণ এই ঘোষণাপত্রটিই বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।

এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম কারণ, ১০ এপ্রিল সরকার গঠনের মাধ্যমেই বিক্ষিপ্তভাবে চলা প্রতিরোধ যুদ্ধ একটি সুশৃঙ্খল রূপ নেয়। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি কমান্ডের অধীনে আসে। একটি বৈধ সরকার না থাকলে বিদেশের সমর্থন ও সাহায্য পাওয়া কঠিন ছিল। এই সরকার গঠনের ফলেই বিশ্ব সম্প্রদায় বুঝতে পারে যে, বাঙালিরা কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে লড়ছে। এই দিনেই সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে (মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা, যা এখন মুজিবনগর) এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবে, যা ১৭ এপ্রিল সম্পন্ন হয়।

১০ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার শপথ নেওয়ার দিন। এই দিনটি প্রমাণ করেছিল যে, বন্দুকের নল নয় বরং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ইচ্ছাই একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি। ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ আমাদের সেই আলোকবর্তিকা, যা আজও গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার পথ দেখায়।

মুজিবনগর সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের চূড়ান্ত বিজয়। ১০ এপ্রিল তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি সার্বভৌম বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক সূচনাবিন্দু।

লেখক: নির্মাতা, সংগঠক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১০

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১১

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১২

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৩

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৪

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৫

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৬

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১৭

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৮

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১৯

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

২০