ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০১ পিএম
ছবি: অমিয় চক্রবর্তী

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৯ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল এক ঘটনাবহুল দিন। একদিকে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর অমানবিক গণহত্যা ও নির্যাতনের তীব্রতা, অন্যদিকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের নানামুখী তৎপরতা—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল চরম উত্তেজনার। একদিকে যেমন দখলদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে রক্ত ঝরেছে বাংলার মাটিতে, অন্যদিকে বিশ্বের দরবারে পাকিস্তান বাহিনীর পৈশাচিকতার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। নিচে ২৯ এপ্রিল ১৯৭১-এর সামগ্রিক ঘটনাবলির একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলো।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার বিশ্ববিবেক

২৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল।

মার্কিন সিনেটে গণহত্যার দলিল: মার্কিন সিনেটর উইলিয়াম সেক্সবি সিনেটের অধিবেশনে ঢাকায় কর্মরত চিকিৎসক ও উন্নয়নকর্মী ডা. জন ই. রড-এর একটি চিঠি পাঠ করেন। চিঠিটিতে ২৫ মার্চের পর থেকে ঢাকায় চালানো গণহত্যার বিভীষিকাময় চিত্র, নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন এবং বৃদ্ধ ও শিশুদের হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা উঠে আসে। এই চিঠিটি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি শক্তিশালী দলিলে পরিণত হয়।

লন্ডনে ব্রুস ডগলাসম্যানের বিবৃতি: ভারতীয় শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে হাউজ অব কমন্সের সদস্য ব্রুস ডগলাসম্যান লন্ডনে ফিরে এক জোরালো বিবৃতিতে জানান, পাকিস্তানি শাসকরা কেবল পূর্ববঙ্গের মাটি চায়, জনগণ নয়। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিদের বিক্ষোভ: লন্ডনে পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের আগমনকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ‘হত্যাকারী খুনিরা ফিরে যাও’, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন করো’—এমন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ জানান।

জাতিসংঘ ও ভারত: জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট তার অবস্থানে অটল থেকে বিষয়টিকে পাকিস্তান সরকারের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, ভারতের রাজস্থান বিধানসভা এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেণ মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং লোকসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবিতে সরব হন। কলকাতায় ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ শিরোনামে আলোকচিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হয়।

প্রবাসী সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা

২৯ এপ্রিল নিউইয়র্কে পাকিস্তান দূতাবাসের বাঙালি কর্মকর্তা মাহমুদ আলীর পদত্যাগের তারবার্তা পেয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাকে অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে তাকে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনের ও বৈশ্বিক স্বীকৃতির কাজ তরান্বিত করার নির্দেশনা দেন।

দখলদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যা

২৯ এপ্রিল সারাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মমতায় অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান:

রংপুর: সেনানিবাসের কাছে ঘাঘট নদীর তীরে ১২৫ জন বাঙালি ইপিআর সদস্যকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সিলেট: সুরমা ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানে হানাদারদের ব্রাশফায়ারে শহীদ হন ৩০ জন চা শ্রমিক।

হবিগঞ্জ: চুনারুঘাট এলাকায় শতাধিক যুবক, ছাত্র ও বৃদ্ধকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

সৈয়দপুর: দালালদের সহায়তায় ট্রেন থেকে নামিয়ে ২৫ জন বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

ঢাকা: সামরিক সরকার ফুলবাড়িয়া, সেক্রেটারিয়েট ও শাহজাহানপুর এলাকা থেকে বাসিন্দাদের উৎখাতের নির্দেশ দেয় এবং দেয়াল থেকে স্বাধীনতার পক্ষে সব স্লোগান মুছে ফেলার ফরমান জারি করে।

বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধ

গণহত্যার জবাব দিতে এদিন মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন স্থানে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে:

কুমিল্লা: বড়কামতায় মুক্তিবাহিনী ও হানাদার বাহিনীর দুই দফা সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধারা দোর্দণ্ড প্রতাপে বিজয় লাভ করেন। এখানে স্থানীয় পাঁচ-ছয় হাজার গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একাত্ম হয়ে যুদ্ধ করেন।

রাজশাহী: শিবগঞ্জ থানার কানপুরে আসাদ আহমদ বায়রণের নেতৃত্বে গেরিলা আক্রমণে তিন পাকিস্তানি সেনা ও দশজন রাজাকার নিহত হয়। এই অপারেশনে ৯-১০ বছরের এক কিশোর পথপ্রদর্শক হিসেবে অনন্য ভূমিকা রাখে।

নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম: সোনাইমুড়িতে নায়েক শফির নেতৃত্বে অ্যামবুশে পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ি অকেজো করা হয়। রামগড় অভিমুখে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখতে মেজর জিয়া মীর শওকতকে জরুরি নির্দেশনা পাঠান। হিলি সীমান্তেও এদিন দিনব্যাপী প্রচণ্ড গোলাবিনিময় হয়।

২৯ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল একাধারে শোক ও সাহসের দিন। একদিকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু এবং নির্বিচার গণহত্যা, অন্যদিকে মুক্তিকামী বাঙালি ও প্রবাসী সরকারের অদম্য মনোবল। আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তান বাহিনীর নিষ্ঠুরতার সত্য ঘটনাগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করায় বিশ্ববিবেক ধীরে ধীরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে শুরু করে, যা ছিল মুক্তি সংগ্রামের জন্য এক বিশাল শক্তি।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (অষ্টম, নবম, ত্রয়োদশ খণ্ড)।

২. দৈনিক পাকিস্তান, ৩০ এপ্রিল ১৯৭১।

৩. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৩০ এপ্রিল ১৯৭১।

৪. আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩০ এপ্রিল ১৯৭১।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

শেখ জামাল: এক অকুতোভয় বীর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকার

নতুন সরকারের আড়াই মাসে ১ হাজার ১৩০টি হত্যা-ধর্ষণ মামলা

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরে শুরু হলো ইউরেনিয়াম লোডিং

ফজলুর রহমানের মন্তব্যে তোলপাড় সংসদ / শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতের রাজনীতি করা অসম্ভব

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

পুলিশি বাধায় পিছু হটেননি সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা / নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি

১০

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক মির্জা ফখরুলের

১১

মুক্তিযুদ্ধের দলিলচিত্রের রূপকার কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

১২

২৬ এপ্রিল ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল

১৩

ইউনূসের ১৮ মাস / অর্থনীতির গভীর ক্ষত ও এক ‘ফোকলা’ উত্তরাধিকারের খতিয়ান

১৪

তপ্ত জনপদে অন্ধকারের শাসন

১৫

জয়পুরহাটের পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যায় আজও আতঙ্কিত স্বজনহারা পরিবার

১৬

২৫ এপ্রিল ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমীকরণ

১৭

২৪ এপ্রিল ১৯৭১: সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম

১৮

২২ এপ্রিল ১৯৭১: মুক্তির বারুদ আর পৈশাচিকতার কালো ছায়া

১৯

২১ এপ্রিল ১৯৭১: শ্রীঅঙ্গনে নারকীয় গণহত্যা ও ভাসানীর কূটনৈতিক উদ্যোগ

২০