ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা, আকাশে বারুদের গন্ধ। এই দিনেই পাবনা সদর উপজেলার জিলাপাড়া এলাকায় রক্ষাকালী মন্দিরের সামনে সংঘটিত হয়েছিল এক বর্বরোচিত গণহত্যা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে সেদিন শহীদ হয়েছিলেন ২০ থেকে ২৫ জন নিরপরাধ মানুষ। যাঁদের অপরাধ ছিল কেবল স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা অথবা প্রাণভয়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

ঐদিন বিকেলবেলা পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বিশাল বহর পাবনা শহরে প্রবেশ করে। শহর দখলের নেশায় তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পুলিশ লাইন্স, সার্কিট হাউস এবং বিসিক এলাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ঘাতকদের একটি দল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পার হয়ে ফজলুল রোড দিয়ে রক্ষাকালী মন্দিরের তিন মাথার মোড়ে এসে পৌঁছায়।

মন্দিরে আশ্রয় ও নির্মম হত্যাকাণ্ড

সে সময় প্রাণভয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ডা. বিহারীলাল সাহার ‘গোবিন্দ বাড়ি’ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কেউবা লুকিয়েছিলেন আশপাশের ঝোপঝাড়ে বা রাস্তার ধারের ঘরে। পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিটি ঘর তল্লাশি করে সবাইকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে রক্ষাকালী মন্দিরের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। মুহূর্তের মধ্যেই গর্জে ওঠে ঘাতকদের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। গুলিতে লুটিয়ে পড়েন ২০ থেকে ২৫ জন মানুষ। রক্তে ভেসে যায় পবিত্র মন্দিরের প্রাঙ্গণ।

শহীদ ও সৌভাগ্যবান বেঁচে যাওয়া কজন

এই গণহত্যাকাণ্ডে শহীদদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। শহীদদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন:

মো. আশরাফ আলী আক্কেল (মনোহরী ব্যবসায়ী)

মো. আকবর আলী (দর্জি)

মো. আফছার আলী (পুলিশ সদস্য)

মো. মোশারফ হোসেন মুশা (ব্যবসায়ী)

অ্যাডভোকেট মো. শফিউদ্দিন

মো. নূরুল হক (জেল পুলিশ)

মো. শফিউন্নবী সূর্য (ড্রাইভার)

মো. হারুনর রশিদ (কাঠমিস্ত্রি)

বিভূতিভূষণ সাহা (ঔষধ ব্যবসায়ী)

এতবড় নৃশংসতার মাঝেও অলৌকিকভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন বিচ্ছু ওরফে ভেগু এবং বদর উদ্দিন শেখ চেরু নামের দুজন ব্যক্তি।

সৎকার ও গণকবর

গণহত্যার পর গভীর রাতে জিলাপাড়ার সাহসী কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহীদদের লাশ উদ্ধারে আসেন। তারা মুসলিম শহীদদের লাশগুলো রক্ষাকালী মন্দিরের পাশের মনসেফ বাবু রোডে (বর্তমান শহীদ মওলানা কছিম উদ্দিন রোড) একটি গণকবরে সমাহিত করেন। তবে হিন্দু শহীদদের সৎকার করা সম্ভব হয়নি। অনেকদিন ধরে তাঁদের মরদেহগুলো মন্দির প্রাঙ্গণেই পড়ে ছিল, যা পরে শিয়াল-কুকুর ও শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। ডা. বিহারীলাল সাহার পুত্র বিভূতিভূষণ সাহার মরদেহটি সেখানেই পচে গলে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।

স্মৃতিসৌধ ও বর্তমান অবস্থা

দেশ স্বাধীনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের বিশেষ উদ্যোগে মনসেফ বাবু রোডের সেই গণকবরের স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। যা আজও দাঁড়িয়ে আছে ১১ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ স্মৃতির সাক্ষী হয়ে।

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা পাবনার মানুষের কাছে এক অবিস্মরণীয় শোকের দিন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ নিজের রক্ত বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজ ৫৬ বছর পর সেই পবিত্র রক্তে ভেজা মন্দির ও গণকবর আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগের মহিমা।

তথ্যসূত্র

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৯ম খণ্ড (এশিয়াটিক সোসাইটি)

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য ও নথিপত্র

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১০

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১১

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১২

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৩

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৪

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৫

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৬

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১৭

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৮

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১৯

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

২০