ঢাকা শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ। গণহত্যার তৃতীয় দিনে ঢাকা এক বিভীষিকাময় ও ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছিল। তবে রাজধানী যখন আতঙ্কে স্তব্ধ, দেশের মফস্বল শহরগুলোতে তখন শুরু হয়ে গিয়েছিল মরণপণ পাল্টা আঘাত।

ঢাকার চিত্র: কারফিউ ও লাশের মিছিল

২৫শে মার্চের বিভীষিকা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২৮ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ সকাল ৭টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিলের ঘোষণা দেয়, যা পরে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

ভুতুড়ে নগরী: কারফিউর অবসরে রাস্তায় নেমে আসা মানুষ কেবল ধ্বংসযজ্ঞই দেখতে পায়। ইংলিশ রোড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তখনও আগুনের ধোঁয়া আর পোড়া মরদেহের স্তূপ দেখা যাচ্ছিল।

পুরান ঢাকার নৃশংসতা: এদিন পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ সংলগ্ন পরিত্যক্ত ভবনে বিউটি বোর্ডিং, প্যারিদাস রোড ও ফরাশগঞ্জ থেকে ধরে আনা বাঙালি শিক্ষক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষসহ ৮৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।

বিদ্যুৎ ও জনজীবন: গণহত্যার নীল নকশা অনুযায়ী ২৫শে মার্চ রাতে বিচ্ছিন্ন করা বিদ্যুৎ সংযোগ এদিন দুপুরের পর ঢাকার কিছু কিছু এলাকায় আংশিক স্বাভাবিক হয়।

গণমাধ্যমের ভাষ্য

টানা দুই দিন বন্ধ থাকার পর এদিন 'দ্য পাকিস্তান অবজারভার' চার পৃষ্ঠার পত্রিকা প্রকাশ করে। তবে পুরো পত্রিকা ছিল পাকিস্তানি জান্তার গুণগান এবং সরকারি প্রেসনোটে ঠাসা।

বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার: এই পত্রিকাতেই অত্যন্ত ছোট পরিসরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশ করা হয়।

ইয়াহিয়ার দাম্ভিকতা: ২৬শে মার্চে দেওয়া ইয়াহিয়া খানের উসকানিমূলক বেতার ভাষণটি এদিন বিস্তারিতভাবে ছাপা হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ তাদের প্রতিবেদনে জানায়, মাত্র দুই দিনে বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি বাহিনী।

রণক্ষেত্র চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চল

চট্টগ্রামের প্রতিরোধ: চট্টগ্রামের দক্ষিণ থেকে বালুচ রেজিমেন্ট এবং উত্তর দিক থেকে আসা পাকিস্তানি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণে বাঙালি সেনা, ইপিআর ও জনতার প্রতিরোধ ব্যূহ চরম বাধার সম্মুখীন হয়। কৌশলগত কারণে বাঙালি যোদ্ধারা কিছুটা পিছিয়ে যান। পাকিস্তানি নৌবাহিনী তাদের নৌবহর থেকে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে গোলাবর্ষণ করে এবং নৌবন্দরে বাঙালি নৌসেনাদের নিরস্ত্র করে হত্যা করে।

রংপুরের লড়াই: রংপুরে এদিন সৃষ্টি হয় এক অনন্য ইতিহাস। কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ লাঠিসোটা আর তীর-ধনুক নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে যায়। পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শতাধিক মানুষ শহীদ হলেও সাঁওতালদের ছোঁড়া তীরে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।

পাবনার বিজয়: পাবনায় সান্ধ্য আইন ভঙ্গের অভিযোগে ১০ জনকে হত্যার পর জনতা খেপে ওঠে। পাকিস্তানি সেনারা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আশ্রয় নিলে সংগ্রামী জনতা তা ঘিরে ফেলে এবং তীব্র লড়াইয়ের পর সব পাকিস্তানি সৈন্যকে খতম করে।

সিলেট ও নোয়াখালী: সিলেটে এমসি কলেজের কাছে চা শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়ে অনেককে পুড়িয়ে ও গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। অন্যদিকে, নোয়াখালীতে আবদুল মালেক উকিলের নেতৃত্বে ইপিআর ও আনসার সদস্যদের নিয়ে সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

বৈশ্বিক প্রতিবাদ

২৮ মার্চ আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম বড় প্রতিবাদ সভাটি অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনে। বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাঙালি ও বিদেশিরা মিলে গণহত্যার প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

তথ্যসূত্র

১. ৭১ এর দশমাস – রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী।

২. একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম।

৩. দ্য পাকিস্তান অবজারভার আর্কাইভ (২৮ মার্চ, ১৯৭১)।

৪. সমসাময়িক সংবাদপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১০

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১১

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১২

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৩

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৪

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৫

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৬

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

১৭

অস্থির ডলার, চাপে টাকা / মধ্যপ্রাচ্যের রণসংঘাতের ছায়া বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে

১৮

১৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার নীলনকশা নিয়ে ঢাকায় ইয়াহিয়া, কালো পতাকায় উত্তাল বাংলা

১৯

১৪ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর হাতে বাংলার শাসনভার ও ঐতিহাসিক ৩৫ দফা

২০