ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক চরম উত্তেজনাকর এবং প্রস্তুতির দিন। একদিকে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের গোপন ও ব্যাপক প্রস্তুতি, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা ও দখলদারিত্বের সম্প্রসারণ— এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতে প্রবাহিত হয়েছিল দিনটি।

মুজিবনগর সরকারের শপথের প্রস্তুতি: গোপনীয়তা ও কৌশল

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর লক্ষ্যে ১৬ এপ্রিল ছিল চরম ব্যস্ততার দিন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং তাঁর সহকর্মীরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।

গোপনীয়তার কারণ: পূর্বে ১৪ এপ্রিল শপথের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও চুয়াডাঙ্গাকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণার খবর সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পাকবাহিনী সেখানে বিমান হামলা চালায়। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে ১৬ এপ্রিলের সকল কার্যক্রম অত্যন্ত গোপন রাখা হয়।

সংবাদমাধ্যমকে আমন্ত্রণ: ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম কলকাতা প্রেসক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের পরদিন ভোরের মধ্যে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান। তবে গন্তব্যস্থল সম্পর্কে তখন কাউকেই জানানো হয়নি।

রণাঙ্গনের পরিস্থিতি: হামলা ও দখলদারিত্ব

১৬ এপ্রিল বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় পাক হানাদার বাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়ে অনেক মুক্তাঞ্চল দখল করে নেয়।

কুষ্টিয়া ও ভেড়ামারা: ১৬ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি সৈন্যরা কুষ্টিয়া ও ভেড়ামারা অভিমুখে চিরুনি অভিযান শুরু করে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার চণ্ডীপুরের পণ্ডিত পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এ সময় সন্তানসম্ভবা সাজেদা বেগমের পেটে গুলি লাগলে তাঁর নবজাতক নিহত হয়, যা ছিল এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি। এর মাধ্যমে কুষ্টিয়া জেলা পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

পঞ্চগড় ও দিনাজপুর: দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ট্যাংক ও ভারি অস্ত্র নিয়ে পাকবাহিনী পঞ্চগড়ের হাওয়া গ্রামে আক্রমণ চালায়। ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং বৃহত্তর দিনাজপুর পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়।

চট্টগ্রাম ও অন্যান্য: সীতাকুণ্ডে নৌবাহিনী ও গোলন্দাজ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এছাড়া কুমিল্লা, আশুগঞ্জ, কসবা এবং রাঙামাটিতে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে সারাদিন সম্মুখযুদ্ধ চলে।

অবরুদ্ধ ঢাকা ও পিস কমিটি গঠন

ঢাকায় পাকবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাল চালতে থাকে।

শান্তি কমিটি গঠন: খাজা খয়ের উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে পাকিস্তানি সমর্থক 'কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি'র ২১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকা ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিতে নুরুল আমিন, গোলাম আজম এবং মাহমুদ আলীর মতো ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, যারা গভর্নর টিক্কা খানকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

কারফিউ ও বলপ্রয়োগ: ঢাকায় কারফিউ ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শিথিল করা হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের জোরপূর্বক কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিশ্ব জনমত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়:

ভারতের ভূমিকা: ভারত সরকার পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায় কলকাতায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতির দাবিতে গণস্বাক্ষর অভিযানের উদ্বোধন করেন।

বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতিবাদ: সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গণহত্যার নিন্দা জানান। শিখ সম্প্রদায় এবং মুসলিম নেতারাও এই পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম: ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান পত্রিকা বাংলাদেশের আন্দোলনকে 'বিংশ শতকের এক বিরল মুক্তি আন্দোলন' হিসেবে অভিহিত করে। কলকাতার নিউ স্টেটসম্যান মন্তব্য করে— “যদি রক্ত স্বাধীনতার মূল্য হয়, তবে বাংলাদেশ তা অতিরিক্তই দিয়ে ফেলেছে।”

১৬ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল একদিকে বিয়োগান্তক রক্তপাতের দিন, অন্যদিকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগের রাতের নিস্তব্ধতা ও প্রস্তুতির ক্ষণ। মেহেরপুরের সেই আমবাগানে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় ছিল সাত কোটি বাঙালি, যা পরদিন ১৭ এপ্রিল ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র:

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: ত্রয়োদশ খণ্ড।

২. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ১, ২, ৭, ৮ ও ১১)।

৩. দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা (১৬ এপ্রিল ১৯৭১)।

৪. আনন্দবাজার পত্রিকা (১৭ এপ্রিল ১৯৭১)।

৫. দৈনিক পাকিস্তান (১৭ এপ্রিল ১৯৭১)।

৬. ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও ঐতিহাসিক আর্কাইভ।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১০

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১১

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১২

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১৩

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১৪

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৫

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৬

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৭

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৮

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৯

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

২০