

মান্না দে’র একটি গান আছে— “সবাই তো সুখী হতে চায়, কেউ হয়, কেউ হয় না।” হঠাৎ এই গানটির কথা মনে পড়ে গেল। শুনলাম, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেছেন যে তিনি নাকি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। হয়তো তার ভায়রার খালাতো বোনের সম্বন্ধীর মামাতো ভাইয়ের ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল; কাজেই তিনি অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!
কিন্তু কেন এই দাবি? তারা তো শুরু করেছিলেন এই বলে যে— “যা করেছি, ভালো করেছি। পাকিস্তান রক্ষা করার জন্য আমাদের পূর্বসূরিরা রুখে দাঁড়িয়েছিল।” এর সাথে মুক্তিযুদ্ধে ‘রিসেট বাটন’ টিপে দিলেন সওদাগর ইউনুস। পতাকা বদলে দেওয়া হবে, জাতীয় সংগীত বদলে দেওয়া হবে— কত কথা! যখন টের পেল বাংলাদেশে এসব করা যাবে না, তখন বলল, “১৯৪৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত কেউ যদি আমাদের কাজে মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে আমরা দুঃখিত।”
তিনি চিকিৎসক, বুদ্ধিমান মানুষ এবং সুন্দর বক্তৃতা দেন; তাই হয়তো সবাইকে বোকা মনে করেন। তিনি ভেবেছিলেন এটুকু বলেই ক্ষমা চাওয়া হয়ে গেল। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস জানেন, সাম্প্রতিক সব ইতিহাস জানেন; শুধু একাত্তরের কথা উঠলে বলেন, “আমরা তখন ছোট ছিলাম।” সব তালবাহানা যখন শেষ এবং এখন বোধহয় ক্ষমতার গন্ধও পাচ্ছেন, তাই তিনি এখন বনে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!
তবে এ কথা হলফ করে বলা যায়, সারা বাংলাদেশে এমন একটি পরিবারও পাওয়া যাবে না যারা বলবে যে ১৯৭১ সালে তারা খুব আনন্দে ছিল, ফুর্তিতে ছিল কিংবা পিকনিক ও যাত্রা-সিনেমা দেখে সময় কাটিয়েছে। এমনকি রাজাকার-আলবদররাও না; কারণ তারাও সব সময় আতঙ্কে থাকত। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, তাই কেউই এর বাইরে ছিল না। সেই কারণেই মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আর সে কারণেই এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হওয়ার হিড়িক পড়েছে। এমনকি কুখ্যাত রাজাকারের সন্তানও এখন এই দাবি করে। তবে গত দুই বছরে তারা নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে যতটা হেয় করেছে, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে নানা গালগল্প সাজিয়ে তারা পুরো মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটি সহজ নয়।
এখনকার প্রজন্ম পাকিস্তানি জেনারেলদের লেখা বই খুঁজে বের করেছে; পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন আর্চার ব্লাডের লেখা ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ এবং সিদ্দিক সালেকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’। কাজেই ইতিহাসকে কিছুদিনের জন্য ঘোলাটে করা সম্ভব হলেও সারা জীবনের জন্য তা পারা যায় না। সেই কারণেই হাজার চেষ্টা করলেও সবাই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হতে পারবে না। আফসোস জামায়াতের আমীর! আপনার কোনো কৌশলই কাজে দিচ্ছে না।
মন্তব্য করুন