

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ঋণ কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সমাজের গভীরে প্রভাব ফেলে, সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক বন্ধন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সমাজের স্থিতিশীলতাকে বিপর্যস্ত করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ এবং ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা গ্রামীণ ও শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন ও সংকট সৃষ্টি করছে। এই প্রভাবগুলো ব্যক্তি, পরিবার এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে কীভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, তা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. সামাজিক কলঙ্ক ও বিচ্ছিন্নতা
ঋণ শোধ করতে না পারার কারণে সামাজিক কলঙ্ক বা লোকলজ্জা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে, যেখানে সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরতা প্রবল, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
অপমান ও অপদস্থতা: এনজিও বা স্থানীয় সুদকারবারিরা প্রায়ই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে কিস্তির জন্য চাপ দেয়, যা প্রকাশ্যে অপমানের কারণ হয়। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহীর মোহনপুরে আকবর হোসেনের ঘটনায় দেখা গেছে, এনজিও কর্মীদের দৈনন্দিন হয়রানির কারণে তিনি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের কাছ থেকে দূরে সরে যান। আঁচল ফাউন্ডেশনের তানসেন রোজ জানান, গ্রামে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা নতুন ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা হারান, যা তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে।
মানসিক চাপ: সামাজিক কটূক্তি ও বিচ্ছিন্নতা মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণের চাপে আত্মহত্যার প্রবণতা গ্রামীণ এলাকায় ৪.২৫ শতাংশ, যা শহরের তুলনায় বেশি।
২. পারিবারিক কাঠামোর উপর প্রভাব
ঋণের চাপ শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়।
পরিবারের বিচ্ছেদ: ঋণ শোধের জন্য পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি, বাড়ি হারানো বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে। পিরোজপুরের নান্না ফরাজীর মতো অনেকে ঋণের চাপে পরিবারের সাথে মৃত্যু বেছে নিয়েছেন।
শিশুদের উপর প্রভাব: ঋণের কারণে শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। বিবিএস-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে, ১৫ শতাংশ পরিবার শিক্ষার খরচ মেটাতে ঋণ নিয়েছে, কিন্তু শোধ করতে না পারায় শিশুরা স্কুল ছাড়ছে। মানিকগঞ্জে ঋণের চাপে এক মা তার দুই সন্তানকে বিষ খাইয়ে মেরেছে, যা শিশুদের প্রতি এই সংকটের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরে।
নারীদের দুর্দশা: নারীরা ঋণের চাপে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। গ্রামীণ এলাকায় নারীরা প্রায়ই ক্ষুদ্রঋণ নেন, কিন্তু পুরুষের তুলনায় তাদের আয়ের সুযোগ কম। ফলে, তারা হয়রানি ও মানসিক চাপের শিকার হন। ২০২৪ সালে নারীদের আত্মহত্যার হার ৪.১৭ শতাংশ, পুরুষদের তুলনায় বেশি।
৩. সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতা হ্রাস
ঋণের চাপ সম্প্রদায়ের সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে।
পারস্পরিক সহযোগিতার হ্রাস: গ্রামীণ সমাজে একসময় প্রতিবেশীরা একে অপরকে সাহায্য করতো। কিন্তু ঋণের চক্রে সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এই সহযোগিতা কমছে। উদাহরণস্বরূপ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
অপরাধ বৃদ্ধি: ঋণ শোধের জন্য কেউ কেউ চুরি, জালিয়াতি বা অন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। ঢাকার কাছাকাছি গ্রামাঞ্চলে ঋণ শোধের জন্য সম্পত্তি বিক্রির নামে জালিয়াতি বেড়েছে।
আত্মহত্যার চেইন রিয়্যাকশন: একজনের আত্মহত্যা অন্যদের মনে প্রভাব ফেলছে। রাজশাহী ও মানিকগঞ্জে পরিবারসহ আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় অন্যরা একই পথ বেছে নিচ্ছেন। এটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও হতাশার পরিবেশ তৈরি করছে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব
ঋণের চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
অবসাদ ও উদ্বেগ: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা ক্রমাগত উদ্বেগ ও অবসাদে ভোগেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণের কারণে ৩৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের সদস্যরা মানসিক চাপে ভুগছেন।
আত্মহত্যার প্রবণতা: ঋণের চাপে আত্মহত্যার হার বেড়েছে। ২০২৪-২৫ সালে দেশব্যাপী আত্মহত্যার হার ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় অংশ ঋণ-সম্পর্কিত। ঝিনাইদহে অর্থনৈতিক কষ্ট ও ঋণকে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিবারের উপর প্রভাব: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক চাপ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, মিনারুল ইসলামের ঘটনায় তার স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পেছনে মানসিক অবসাদ ও হতাশা কাজ করেছে।
৫. অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব
বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ঋণের সামাজিক প্রভাবকে আরও তীব্র করছে।
অর্থনৈতিক মন্দা: ২০২৪ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। হাজার হাজার কারখানা বন্ধ, বেকারত্ব বৃদ্ধি (১২ শতাংশ) এবং মূল্যস্ফীতি (৯.৮ শতাংশ) ঋণ পরিশোধকে অসম্ভব করে তুলেছে। ফলে, গ্রামীণ পরিবারগুলো আরও ঋণের ফাঁদে পড়ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ হ্রাস করেছে। এটি কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়েছে, যা ঋণ শোধের ক্ষমতা আরও হ্রাস করছে।
প্রবাসীদের প্রভাব: প্রবাসী বাংলাদেশিরা, যারা পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতো, তারাও অর্থনৈতিক সংকটে ঋণ নিচ্ছে। এটি পরিবারের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষতি
ঋণের সামাজিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে সমাজের কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
শিক্ষার অবনতি: ঋণের চাপে শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় ঋণগ্রস্ত পরিবারের ২০ শতাংশ শিশু স্কুল ছেড়ে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য সমস্যা: ঋণের চাপে চিকিৎসার অভাব বাড়ছে। মানিকগঞ্জে একটি ঘটনায় অসুস্থতা ও ঋণের চাপে মা-মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
সামাজিক অস্থিরতা: সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা ও অবিশ্বাস বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংঘাতের কারণ হতে পারে।
সমাধানের পথ
ঋণের সামাজিক প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন-
ঋণ নিয়ন্ত্রণ নীতি: এনজিও এবং স্থানীয় সুদকারবারিদের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। ঋণ দেওয়ার আগে ব্যক্তির আয় ও শোধের ক্ষমতা যাচাই করা।
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা: গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি।
অর্থনৈতিক সংস্কার: কারখানা পুনরায় চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
সামাজিক সচেতনতা: লোকলজ্জা ও কলঙ্ক দূর করার জন্য ক্যাম্পেইন চালানো।
সরকারি ভর্তুকি: দরিদ্র পরিবারের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যের জন্য ভর্তুকি প্রদান।
ঋণের সামাজিক প্রভাব বাংলাদেশের সমাজকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক বিচ্ছেদ, মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। সমাধানের জন্য সরকার, এনজিও এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ঋণ যেন আর মৃত্যুর ফাঁদ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের জন্য এখন সময় একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ার।
সূত্র
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান-২০২৩।
- আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন, ২০২৪।
- ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন, ২০২৪।
- বিভিন্ন সংবাদপত্র: প্রথম আলো, দৈনিক কালের কণ্ঠ, দ্য ডেইলি স্টার (২০২৪-২৫)।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অতনু রব্বানীর সাক্ষাৎকার, ২০২৪।
মন্তব্য করুন