ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ-পাহাড়: সংস্কার নাকি আইনি জটিলতার হাতছানি?

ইলাস্ট্রেশন: টিবিএস এর সৌজন্যে

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের মেটিকুলাস ডিজাইনে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছিল অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একটি ভেঙে পড়া শাসনব্যবস্থাকে সচল করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে তারা বেছে নিয়েছিল ‘অধ্যাদেশ’-এর পথ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই অতি-উৎসাহী অধ্যাদেশ জারি কি শেষ পর্যন্ত আইনি মারপ্যাঁচে স্থায়িত্ব হারাবে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর এখন আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১১৫টিরও বেশি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ।

অধ্যাদেশ জারির পরিসংখ্যান ও গতিপ্রকৃতি

আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৩৩টির মতো অধ্যাদেশ জারি করেছে (মতভেদে ১১৫টি)। পরিসংখ্যান বলছে, সময় যত গড়িয়েছে, অধ্যাদেশ জারির গতি তত বেড়েছে। ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি ৯ দিনে একটি অধ্যাদেশ জারি হলেও ২০২৬ সালের শুরুতে তা গড়ে দেড় দিনেরও কমে দাঁড়িয়েছে। একটি অনির্বাচিত ও অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে এত বিপুল সংখ্যক অধ্যাদেশ জারি করা কতটা ‘আশু ব্যবস্থা’ গ্রহণের আবশ্যকতা ছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সংবিধানের বেরসিক ৯৩ অনুচ্ছেদ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে সংসদহীন অবস্থায় অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দিলেও সেখানে তিনটি শক্ত দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে: ১. সংসদ যে আইন করতে পারে না, অধ্যাদেশ দিয়ে তা করা যাবে না। ২. অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন বা বিলুপ্ত করা যাবে না। ৩. কোনো অধ্যাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না।

সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো ৯৩(২) অনুচ্ছেদ। সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে যদি এই অধ্যাদেশগুলো আইন হিসেবে পাস না হয়, তবে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মৃত’ বা বাতিল বলে গণ্য হবে। আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১১ এপ্রিলের মধ্যে এই বিশাল অধ্যাদেশ-পাহাড়কে আইনে রূপান্তর করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে নবনির্বাচিত সরকারের সামনে।

‘দায়মুক্তি’ ও সাংবিধানিক বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধিকাংশ অধ্যাদেশ তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ২৫ জানুয়ারি জারি করা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’। এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সব ফৌজদারি অপরাধ থেকে ঢালাও আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আবার ‘গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর ২২ ধারায় ‘সরল বিশ্বাসে’ কৃত কাজের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল জাতীয় সংসদই দায়মুক্তির বিধান প্রণয়ন করতে পারে। রাষ্ট্রপতি বা অন্তর্বর্তী সরকারের এই এখতিয়ার নিয়ে আইনি প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। এছাড়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা গণভোটের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ইতিপূর্বেই হাইকোর্টে রিট হয়েছে। যদি আদালত মনে করেন যে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মতো ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ছিল না, তবে শরীয়তুল্লাহ বনাম বাংলাদেশ (২০০৯) মামলার নজির অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ অবৈধ ঘোষিত হতে পারে।

আইনি ও নৈতিক সংকট

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বহু ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছে, মাজার ভাঙা বা সংবাদমাধ্যমের ওপর মব জাস্টিসের মতো ঘটনা ঘটেছে। অথচ উপদেষ্টারা শপথ নিয়েছিলেন ‘ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী’ না হয়ে কাজ করার। এখন দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করে সেই সব কৃতকর্মের জবাবদিহি এড়ানোর চেষ্টা কতটা নৈতিক, তা নিয়ে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকেও ভাবতে হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার যেহেতু আইনের শাসনের ওপর জোর দিচ্ছে, তাই এই ‘দায়মুক্তি’ কালচার বজায় রাখা তাদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হতে পারে।

রাষ্ট্র সংস্কার একটি মহৎ উদ্দেশ্য হতে পারে, কিন্তু তা করার প্রক্রিয়াটি যদি অসাংবিধানিক হয়, তবে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো ভেবেছিল অধ্যাদেশ জারিই সব সমস্যার সমাধান, কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে এগুলো নিতান্তই সাময়িক ব্যবস্থা।

এখন নবনির্বাচিত সংসদের সামনে বিশাল পাহাড়সম কাজ। তারা কি ১৩৩টি অধ্যাদেশই আইন হিসেবে পাস করবে? নাকি বাছাই করে বিতর্কিতগুলো বাতিল করবে? যদি ৩০ দিনের মধ্যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগুলো পাস না হয়, তবে এই দেড় বছরে নেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ সংকটে পড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অতি-উৎসাহ’ শেষ পর্যন্ত দেশের বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগে এক দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা রেখে গেল কি না, সময় তার বিচার করবে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ-পাহাড়: সংস্কার নাকি আইনি জটিলতার হাতছানি?

‘ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার হুঁশিয়ারি’

৮ ক্যাটাগরিতে ৯ বিশিষ্টজন পাচ্ছেন বাংলা একাডেমি পুরষ্কার

শহীদ বেদীতে জামায়াতের রাজনীতির ফুল

বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: কৃষিখাতের জন্য একটি ‘ট্রোজান হর্স’

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন / ইরানে বড় আক্রমণের কথা ভাবছেন ট্রাম্প

বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নিয়ে ইইউর কঠোর বার্তা

চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ডিসিসিআইয়ের

রাজধানীতে সক্রিয় ১২৭ কিশোর গ্যাং, নিরাপত্তা সংকট

১০

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১: রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ও শঙ্কা, ছাত্রলীগের সমাবেশ

১১

একুশের চেতনা: বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

১২

দূর্গম পাহাড়ে একুশের গান / ম্রো শিশুদের কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ (ভিডিও)

১৩

শহীদ মিনারে জামায়াত আমিরকে ঘিরে ‘রাজাকার’ ও ‘একাত্তরের দালাল’ স্লোগান (ভিডিও)

১৪

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি / ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের গৌরবময় ইতিহাস

১৫

সবচেয়ে খারাপ রিক্রুটতো ছিলেন ইউনূস: খালেদ মুহিউদ্দীন (ভিডিও)

১৬

অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক খাতে পুঁজির প্রবাহ ও ব্যয় উভয়ই বাড়ছে

১৭

নারী স্বাধীনতা আর পিতৃতান্ত্রিক অন্ধকার

১৮

প্রকৃত পরীক্ষা আসলে খারাপ সময়েই হয়

১৯

এইসবের জবাবদিহি হবে না?

২০