
২১ ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ নাম না জানা আরও অনেকে। মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত দেওয়ার এই বিরল ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে। এই আন্দোলন শুধু একটি ভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথপ্রদর্শক।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি [ঔপনিবেশিক শেকড় ও সাম্প্রদায়িক ভাষারাজনীতি]
ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল অনেক আগেই। ১৮৬৭ সালে বেনারসে হিন্দু নেতাদের এক বৈঠকে ভারতের সরকারি ভাষা হিন্দি করার ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দি-উর্দু বিতর্কের জন্ম হয়, যা উপমহাদেশের সমাজে ভাষাকে ভিত্তি করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবেশ ঘটায় । উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে সৈয়দ আহমদ খান, খাজা সলিমুল্লাহর মতো কিছু মুসলিম নেতা উর্দুকে ভারতীয় মুসলমানদের সাধারণ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, কারণ পারসি-আরবি লিপির কারণে উর্দুকে ইসলামি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা হতো । অন্যদিকে, ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দ ধরে বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত ছিল।
১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষ্মৌ অধিবেশনে উর্দুকে ভারতের মুসলমানদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে মনোনয়নের প্রস্তাবটি বাংলার সভ্যরা প্রত্যাখ্যান করেন । ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম প্রস্তাবিত ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের বঙ্গীয় অঙ্গরাজ্যের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রস্তাব করেছিলেন ।
পাকিস্তান সৃষ্টি ও রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের সূচনা
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় । পাকিস্তানের দুটি অংশের (পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান) মধ্যে ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো মিল ছিল না। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের ব্যবধানে অবস্থিত এই দুই অংশকে এক করা হয়েছিল শুধু ধর্মের ভিত্তিতে ।
পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বেই রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের প্রশ্ন উঠেছিল। মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন, যার প্রতিবাদ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ বাংলার বুদ্ধিজীবী ও লেখকগণ । পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিশ, যা ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠন । এই সংগঠনের উদ্যোগে ১৫ সেপ্টেম্বর 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' শীর্ষক প্রথম পুস্তিকা প্রকাশিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় ।
ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সংবিধান সভার কাছে সুপারিশ করা হয় । এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলার ছাত্রসমাজ সংগঠিত হতে থাকে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরেই প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঞা ।
জিন্নাহ ও নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা: আগুনে ঘৃতাহুতি
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুতে কার্যক্রম শুরু হলে পূর্ব বাংলা কংগ্রেস পার্টির সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকেও অধিবেশনের অন্যতম ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান, যা মুসলিম লীগের সদস্যরা প্রত্যাখ্যান করে ।
সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আঘাত আসে ১৯৪৮ সালের মার্চে। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন এবং ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন, 'উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' । কার্জন হলে তার এই ঘোষণার সময় উপস্থিত ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ জানায় । ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের মতে, জিন্নাহ মৃত্যুর আগে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে বলে গিয়েছিলেন যে তিনি উর্দুর পক্ষে মত দেওয়ার ভুল করেছিলেন ।
১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খান নিহত হওয়ার পর খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি (অন্য মতে ২৭ জানুয়ারি) পল্টন ময়দানের এক জনসভায় তিনি পুনরায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন । এই ঘোষণায় পূর্ব বাংলার জনগণ প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পূর্ণ ধর্মঘট পালন করে এবং ৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয় ।
১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও বিক্ষোভ
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল পাকিস্তান সরকারের বাজেট অধিবেশনের দিন। আন্দোলন বানচাল করতে সরকার পূর্বেই ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জড়ো হতে শুরু করে । সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্ররা এক জরুরি বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সর্বাত্মক হরতাল পালনের মাধ্যমে প্রতি দশজনের একটি মিছিল বের করে ।
গুলিবর্ষণ ও শহীদগণ
সোয়া এগারোটার দিকে ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ শুরু করে । এই গুলিতে শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ অনেকে।
শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
আবুল বরকত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমএ ক্লাসের ছাত্র। ১৬ জুন ১৯২৭ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ।
আব্দুল জব্বার: ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁওয়ের পাঁচুয়া গ্রামে ১৩ আগস্ট ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণকারী এই সাধারণ কর্মজীবী বিবাহিত ছিলেন এবং তার ১৫ মাস বয়সী একটি ছেলে ছিল ।
রফিক উদ্দিন আহমদ: মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইরের পারছিল গ্রামে ৩০ অক্টোবর ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দেবেন্দ্রনাথ কলেজের বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন ।
আব্দুস সালাম: ফেনী জেলার দাগনভূঞার লক্ষণপুর গ্রামে ২৭ নভেম্বর ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ডিরেক্টর অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অফিসে রেকর্ড কিপার পদে চাকরি করতেন ।
শফিউর রহমান: ২৪ জানুয়ারি ১৯১৮ সালে ভারতের হুগলি জেলার কোন্নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ক্লাসের প্রাইভেট ছাত্র ছিলেন। ২২ ফেব্রুয়ারি বংশাল রোডে তিনি শহীদ হন ।
শুধু এই পাঁচজন নন, ভাষা আন্দোলনে আরও অনেকেই শহীদ হন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোড ও বংশাল রোডে পুলিশের গুলিতে কতজন মারা গেছেন তার সঠিক সংখ্যা অজানা, কারণ তাদের লাশ পুলিশ নিয়ে যায় । কবি আহমদ রফিক তার 'একুশ থেকে একাত্তর' বইয়ে আবদুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ ও সিরাজুদ্দিনের নাম উল্লেখ করেছেন । ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত একটি স্মারক গ্রন্থের 'একুশের ঘটনাপুঞ্জী' প্রতিবেদনে দাবি করা হয় ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি সর্বমোট ৩৯ জন শহীদ হয়েছেন ।
প্রতিক্রিয়া ও আন্দোলনের বিস্তার
গুলিবর্ষণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সারা শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সভা-শোভাযাত্রা বের করে । আইনসভায় মনোরঞ্জন ধর, বসন্তকুমার দাস, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ ছয় বিধায়ক আহত ছাত্রদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার এবং শোকের চিহ্ন হিসেবে গণপরিষদ মুলতবির দাবি জানান। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, শরফুদ্দীন আহমেদসহ সরকারি দলের কিছু সদস্যও এই দাবি সমর্থন করলেও মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন তা প্রত্যাখ্যান করেন ।
এই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। বেগম আফসরুন্নেসা, লিলি খান, আনোয়ারা খাতুন, সুফিয়া ইব্রাহিম ও শাফিয়া খাতুন ভাষা-সৈনিক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ।
ভাষা আন্দোলনের ফলাফল ও গুরুত্ব [রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি]
ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয় । ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, "উর্দু এবং বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা" । যদিও ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার পুনরায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয় ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে প্রথম পদক্ষেপ
ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল না, এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। ১৯৫২ সালের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন বাঙালিকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে । ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির মধ্যে অধিকার সচেতনতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ প্রশস্ত করে ।
সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলন থেকেই ক্রমাগতভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের চেতনা বিকশিত হয়। ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের ভাষায়, "ভাষা আন্দোলনকে স্বীকার করে নিতে হবে এটা বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের আন্দোলন" ।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
বাংলা ভাষা আন্দোলন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের জমা দেওয়া এবং ২৮টি দেশের সমর্থনে গৃহীত খসড়া প্রস্তাবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় । ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাবিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে, যা ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের অঙ্গীকারের প্রতীক।
একুশের চেতনা ও সংস্কৃতি [একুশের গান ও সাহিত্য]
একুশের চেতনা বাঙালির সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, কবিতা ও নাটক। সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অমর সৃষ্টি আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি" গানটি । এই গানে প্রথম সুরারোপ করেন আব্দুল লতিফ এবং পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহমুদ নতুন করে সুরারোপ করেন, যা বর্তমানে একুশের প্রভাতফেরির অপরিহার্য অংশ । বিবিসি শ্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এটি তৃতীয় স্থান লাভ করে এবং সুইডিশ ও জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে ।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ফজল এ খোদার লেখা 'সালাম সালাম হাজার সালাম' গানটি (সুর ও শিল্পী আব্দুল জব্বার) এবং আব্দুল লতিফের লেখা 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়' গানটি । ভাষা আন্দোলন বিষয়ক উল্লেখযোগ্য নাটক হলো মুনীর চৌধুরীর 'কবর', যা ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম মঞ্চস্থ হয় এবং উপন্যাস 'আরেক ফাল্গুন' ।
শহীদ মিনার ও প্রভাতফেরি
একুশের চেতনার বাস্তব প্রতীক হলো শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের গণহত্যার স্থানে নির্মিত এই আনুষ্ঠানিক ও প্রতীক ভাস্কর্যটি বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু । প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। একুশের ভোরে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরি ও আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে সর্বস্তরের জনতা।
ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য ও উত্তরাধিকার ভাষা আন্দোলন বাঙালির ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায়। এটি প্রমাণ করে যে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জাতিকে একতাবদ্ধ করতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি প্রথমবারের মতো সংগঠিত হয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারে বদ্ধপরিকর হয়েছিল ।
আজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষেরা তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় একুশের চেতনা থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে। ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পুলিশের গুলিতে ১১ বাঙালি শহীদ হন এবং পরবর্তীতে ওই অঞ্চলে বাংলা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পায় । পাকিস্তানের করাচি শহরেও বাংলাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে ।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির চেতনার প্রতীক। মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এই বিরল ইতিহাস বিশ্বের বুকে বাঙালি জাতিকে অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা আজ সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং বিশ্বের ৩০ কোটিরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা হিসেবে চতুর্থ সর্বাধিক প্রচলিত ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ।
আজ এদেশের প্রায় ২২ কোটি এবং বিশ্বব্যাপী ৩০ কোটির বেশি মানুষের ভাষা বাংলার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার লড়াইটি কিন্তু শেষ হয়নি। বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিশ্ব দরবারে এর যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নতুন প্রজন্মকেও সোচ্চার থাকতে হবে। একুশের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। আর এই ভিত্তি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি..." — এই অমর সুরে আজও বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ভাষা শহীদদের। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনার, আর বাঙালির প্রাণে জাগে একুশের চিরন্তন চেতনা।
মন্তব্য করুন