
ভদ্রলোককে আমি চিনি না। না চেনাটা আমার নিজেরই সীমাবদ্ধতা—কারণ লোকটা নাকি বুদ্ধিজীবী হিসেবে বেশ চেনাজানা। আমাদের মেহের আফরোজ শাওন ফেসবুকে একটা ভিডিও পোস্ট করেছে, সেখানে দেখলাম এই লোকটা বেশ সেজেগুজে একটা শো-তে কথা বলছেন তারেক রহমানের কন্যা জায়মা রহমান সম্পর্কে। তা তিনি বলুন, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তিনি যখন তুলনার ছলে আরেকটি মেয়েকে ছোট করতে চেষ্টা করেন, সেটা ভালো কাজ হয়নি। তুলনা নিয়েও সেরকম আপত্তির কিছু ছিল না—কিন্তু তিনি যে ভাষায়, যে উপমায় শেখ হাসিনার দৌহিত্রীকে আক্রমণ করেছেন, সেটা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ হয়েছে।
লোকটার নাম নাকি ফাহাম আব্দুস সালাম। আরও জানতে পারলাম তিনি নাকি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামাতা। মির্জা সাহেবের জন্যে আমার মায়া লাগলো। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আমরা নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে জানি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁকে সকলেই পছন্দ করেন। আমার মনে আছে তিনি একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আমি দেখেছি চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে সিঙ্গাপুরে পাঠানো যায় কিনা। এইরকম একজন ভদ্রলোকের ঘরে কিনা জামাতা হিসেবে ঢুকেছে এইরকম একটা চাঁড়াল টাইপ ব্যাটা।
লোকটা ভীষণ বিজ্ঞের মতো চেহারা করে শেখ হাসিনার দৌহিত্রীকে ‘ছাপড়িতুন্নেসা’ বলে পরিহাস করছিল। কেন? কেননা তার হাতে ট্যাটু ইত্যাদি। তো ভাই, ট্যাটু আপনার পছন্দ না, ঠিক আছে, আপনি ট্যাটু করাবেন না। আমার বাঁ বাহুতে একটা কাস্তে-হাতুড়ির ট্যাটু আছে। আমার ছোট কন্যার বাহুতে ট্যাটু আছে সবুজ গুল্ম ফুল লতাপাতা। আমার বোনের ঘাড়ে-হাতে ট্যাটু আছে। আমি বাংলাদেশের অনেক বিশিষ্ট ভদ্রমহিলাকে চিনি যাদের শরীরে ট্যাটু আঁকা। আমি নিজে সেরকম ভালো বা বড় কেউ নই, কিন্তু যেসব নারীর শরীরে ট্যাটু আঁকা দেখেছি, এরা সকলেই বিদ্যা-বুদ্ধি, সাংস্কৃতিক রুচিতে খুবই উঁচু মানের মানুষ।
তিনি জায়মা রহমান প্রসঙ্গে বলছিলেন, সত্তর-আশির দশকের বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নারীদের কথা বলছিলেন সাংস্কৃতিক মানদণ্ড বোঝাতে। আমি জানি না তিনি কোথায় পেলেন যে সত্তর-আশির দশকে শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত নারীরা ট্যাটু আঁকতেন না, বা এই ধারণা তার কী করে হলো যে শরীরে ট্যাটু আঁকলে তাকে ‘ছাপড়িতুন্নেসা’ বলা যায়? কোন বিচারে? এগুলি তো অতি হীন ধরণের রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা। নারী-পুরুষের সমতা তো দূরের কথা, নারীর প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাও যদি কারো থাকে, কেউ যদি পরিবার থেকে ন্যূনতম শিভ্যালরি, সৌজন্য বা সদাচার শিখে থাকে, তাহলে তো এইরকম কথা বলতে পারে না।
সেই কথাগুলিই বলতে হয়, যে কথাগুলো জায়মা রহমানের ডিসকোতে যাওয়া ভিডিও প্রসঙ্গে বলেছি, আমাদের মেয়েরা নিজেদের জীবন নিজেরা যাপন করবে নিজেদের ইচ্ছামতো। আপনার পিতার তাতে কী অসুবিধা? ওরা যেরকম খুশি সেরকম পোশাক পরবে। সারা গায়ে ট্যাটু আঁকবে, গথ স্টাইলে কালো পোশাক পরবে, কালো লিপস্টিক পরে স্মোকি চোখ বানিয়ে পার্টিতে যাবে। ক্লাবে গিয়ে নাচবে, গাইবে, সিগারেট টানবে, চাইলে একটু পানও করবে। তাতে আপনার কী? আমাদের মেয়েরা ওদের নিজেদের ইচ্ছামতো সাজপোশাক করবে, আপনি কেন সেগুলো নিয়ে কটু কথা বলবেন? আমাদের মেয়েরা কি আপনার অনুমোদন চেয়েছে?
এই লোকের শারীরিক বয়সের কথা তো আমি জানি না, কিন্তু একথা বলতে পারি যে চেতনার বয়স তার হাজার বছর। তিনি সেই অন্ধকার যুগেরই একজন, যে কিনা নারীকে পুরুষের অধীন একটি সুদৃশ্য প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করেন। এরা নারীকে কখনো পুরুষের সমান বিবেচনা করেন না, নারীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ বিবেচনা করেন না—এদের চোখে নারী হচ্ছে সেইসব ঊনমানুষ, যারা নিজের ইচ্ছার মালিক নয়, নিজের জীবনের মালিক নয়, নিজের জীবনযাত্রা নিজের পছন্দে নির্ধারণ করতে পারে না। আমি আপনাদের নিশ্চয়ই করে বলতে পারি, আমাদের মেয়েরা এইসব মন্দ লোকের অন্ধকার দৃষ্টিভঙ্গির তোয়াক্কাই করে না—হোক সে আমার কন্যা, তারেক রহমানের কন্যা কিংবা শেখ হাসিনার দৌহিত্রী।
ভিডিওটি আমি সংযুক্ত করলাম না—এইসব আজেবাজে কথা অধিক প্রচার না হওয়াই উত্তম।
মন্তব্য করুন