ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

“যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর/ তা আজও আমরা দেখিনি।/ সব থেকে সুন্দর শিশু/ আজও বেড়ে ওঠে নি।/ আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো/ আজও আমরা পাই নি।”

নাজিম হিকমতের এই কবিতার পঙ্ক্তিগুলো আজ বাংলাদেশের কারাগারের একটি গেটে এসে মূর্ত হয়ে উঠেছে এক করুণ প্রতীক হয়ে। বাগেরহাটের জুয়েল হাসান সাদ্দাম নামের একজন তরুণ কারাবন্দি যখন তার স্ত্রী স্বর্ণালী এবং অবুঝ শিশু সন্তানের শবদেহ দেখতে পেল কারাগারের গেটে, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা ও আইনের নামে নৈতিকতার অবলুপ্তির এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো।

বিচারবিহীন আটক: নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার

সাদ্দামের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান একটি ভয়াবহ প্রবণতার চরম প্রকাশ – বিচারবিহীন দীর্ঘ আটককে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। ফরেনসিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৪২% রাজনৈতিক বন্দীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলার প্রমাণপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি নির্ধারিত সময়ে। এরা আইনের বাইরে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থেকে যাচ্ছেন মাসের পর মাস।

এই পদ্ধতি শুধু বিরোধী দল নয়, ক্ষমতাসীন দলের ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্যও সমান বিপজ্জনক। সাদ্দাম ছাত্রলীগের একজন নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এই যন্ত্রের শিকার হয়েছেন – যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক পালবদলের এই যুগে আনুগত্যই একমাত্র নিরাপত্তা, নয়তো নীতি বা দলীয় পরিচয়।

মানবিকতার মৃত্যু: প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা

যশোর কারাগারের কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আচরণ আইনের শাসনের চেয়ে ক্ষমতার প্রদর্শনীকেই প্রাধান্য দিয়েছে। প্যারোলে মুক্তির আবেদন বাতিল কিংবা উপেক্ষা করার নীতিগত সিদ্ধান্তটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে:

১. প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্যারোল সিস্টেমের ব্যর্থতা: বাংলাদেশের প্যারোল নীতিমালা স্পষ্ট করে যে বিশেষ মানবিক কারণে বন্দীদের অস্থায়ী মুক্তি দেওয়া যায়। স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুশোক এর চেয়ে বড় মানবিক কারণ কী হতে পারে?

২. মানবাধিকারের নামে অমানবিকতা: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ২৭৪টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে মানবিক কারণে মুক্তি না দেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।

৩. রাষ্ট্রীয় সহানুভূতির মৃত্যু: একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার আইনে নয়, তার মানবিকতায়। এই ঘটনা প্রশ্ন তোলে – আমরা কী এমন এক রাষ্ট্র গড়ে তুলছি যেখানে ক্ষমতার দর্পই চূড়ান্ত, মানুষের বেদনা গৌণ?

রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি

সাদ্দামের ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিশোধের একটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। এটি শুধু ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়, তার মানবিক সম্পর্কগুলোকে ধ্বংস করে তাকে চিরতরে ভেঙে দেওয়ার একটি পদ্ধতি। বাংলাদেশে এই পদ্ধতি এখন নিয়মে পরিণত হচ্ছে:

গণমাধ্যমের ভীতিকরণ: ২০২৪ সালে ৪৭টি সংবাদমাধ্যম বন্ধ হওয়ার তথ্য রয়েছে প্রেস কাউন্সিলের নথিতে

আইনের নির্বাচনী প্রয়োগ: একই অপরাধে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ও বিরোধী দলের সমর্থকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার শাস্তি

বিচার ব্যবস্থার রাজনীতিকরণ: উচ্চপদস্থ বিচারপতিদের বক্তব্য থেকেই এটি স্পষ্ট

সমাজে জমে থাকা ক্ষোভ: একটি বিস্ফোরণের অপেক্ষা

সাদ্দামের স্ত্রী স্বর্ণালীর আত্মহনন শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি সমাজের চূড়ান্ত হতাশার প্রকাশ। যখন রাষ্ট্র নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, যখন ন্যায়বিচার পাওয়া বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন ব্যক্তির আত্মহননই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত প্রতিবাদ।

মনোবিজ্ঞানী ড. মাহবুবুর রহমান তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারবিহীন আটকের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় ৩.৭ গুণ বেশি। সাদ্দামের পরিবার এই পরিসংখ্যানের শুধু একটি সংখ্যা নয়, একটি জীবন্ত-মৃত প্রতীক।

পথহারা মানবিকতা: ফিরে আসার উপায়

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন:

১. বিচারবিহীন আটক বন্ধ: বিশেষ আইনের অপব্যবহার বন্ধ করে সংবিধানের ৩৩ ধারা (গ্রেপ্তার ও আটকের ব্যাপারে রক্ষাকবচ) পুরোপুরি প্রয়োগ করতে হবে।

২. মানবিক মুক্তির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: কারাবন্দিদের মানবিক কারণে মুক্তির জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন।

৩. রাজনৈতিক সংলাপ: রাজনৈতিক বিরোধ দূর করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার।

৪. মানবাধিকার শিক্ষা: রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল পর্যায়ে মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।

আমরা কোন বাংলাদেশ চাই?

সাদ্দাম আজ শুধু একজন শোকাহত স্বামী ও পিতা নন, তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের বিচারবিহীন আটক, রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার জীবন্ত প্রতীক। তাঁর স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যু আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে – আমরা কী এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে কারাগারের গেটেই শেষ দেখা হয় প্রিয়জনদের?

নাজিম হিকমত যেমন বলেছিলেন, “মধুরতম যে-কথা আমি বলতে চাই, সে কথা আজও আমি বলি নি।” বাংলাদেশের জন্য সেই মধুরতম কথা হতে পারে: “ক্ষমা, মানবিকতা ও ন্যায়বিচার।” কিন্তু এই কথাগুলো বলতে আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? নাকি এই কথাগুলোই চিরতরে বলার সুযোগ হারিয়ে যাবে প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার গহ্বরে?

একটি রাষ্ট্র তখনই মহান হয় যখন তার দুর্বলতম নাগরিকের কান্নাও শোনার জন্য কর্ণপাত করে। সাদ্দামের নীরব কান্না কি শুনবে এই রাষ্ট্র? নাকি ক্ষমতার দর্পে এতটাই অন্ধ আমরা যে মানুষের বেদনা আমাদের স্পর্শই করে না? সময়ই তার উত্তর দেবে। কিন্তু ভয় হয়, সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে আরও কত সাদ্দামকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখতে হবে কারাগারের গেটে – তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পবিপ্রবির ‘মুক্ত বাংলা’: উপকূলীয় জনপদে স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারী ও তাদের বিলাতযাত্রা

নির্বাচনের মাঠে ধর্মের কার্ড: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

নারী ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ আশঙ্কাজনক: মাহদী আমিন

সরকারের কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা / অর্থাভাবে বন্ধ হতে পারে বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

নয়া প্ল্যাটফর্ম নয়, পুরানো ভণ্ডামির নতুন দোকান

ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ হোক

জামায়াতে ইসলামী অনুতপ্ত নয় একাত্তরের জন্য ক্ষমা চায়নি

নিজে নিজে না নিভলে নেভে না যে আগুন

১০

বৈষম্যের অভিশাপ / নতুন প্রজন্ম কি কেবলই একটি ‘বন্দি’ প্রজন্ম?

১১

ঋণের বোঝায় বাড়ছে আত্মহত্যা: অর্থনৈতিক সংকটের ছায়ায় এক চলমান মানবিক বিপর্যয়

১২

ঋণের সামাজিক প্রভাব: একটি গভীর সংকটের ছায়া

১৩

অবশেষে ‘ঠাণ্ডা-লড়াইয়ে’ জয়ী ওয়াকার!

১৪

উন্নয়নের ‘আইএমএফ মডেল’ থেকে বেরিয়ে আসা যে কারণে জরুরি

১৫

জুলাই ঝুলিয়ে হ্যাঁ-না জটিলতা

১৬

শালীনতা-অশালীনতা যখন বোঝার বিষয়

১৭

জুলাই সনদ ও গণভোট: গণতন্ত্র রক্ষায় বিএনপির সতর্ক অবস্থান

১৮

একতারার কান্না ও অঙ্গার হওয়া শৈশব: বাংলাদেশ কি তবে অন্ধকারের মরণফাঁদে?

১৯

রাজনীতির দাবা খেলা / নিয়োগকর্তারা সব চলে গেলেন, কিন্তু নিয়োগ বহাল থাকল

২০