ঢাকা বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১০ মার্চ ১৯৭১: ঘরে ঘরে স্বাধীনতার নিশান ও চক্রান্তের কালো মেঘ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
১০ মার্চ ১৯৭১: ঘরে ঘরে স্বাধীনতার নিশান ও চক্রান্তের কালো মেঘ

১৯৭১ সালের ১০ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের নবম দিন। এদিন সমগ্র বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারি-বেসরকারি ভবন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কুঁড়েঘরেও উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা এবং আন্দোলনের সমর্থনে শোকের প্রতীক কালো পতাকা।

১. ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার পতাকা ও শোকের প্রতীক

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এদিন সারাদেশে শোক পালিত হয়।

কালো পতাকার আধিপত্য: সরকারি ও বেসরকারি ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। এমনকি রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও কালো পতাকা ওড়ে, যা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।

মানচিত্র খচিত পতাকা: অনেক জায়গায় কালো পতাকার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত নতুন পতাকাই বাঙালির প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে।

২. বঙ্গবন্ধুর বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক ও হুঁশিয়ারি

সকালে বঙ্গবন্ধু তার ধানমন্ডির বাসভবনে একদল বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হন।

দৃঢ় সংকল্প: তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানান, "সাত কোটি বাঙালি আজ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং যেকোনো মূল্যে তা আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।" তিনি আরও বলেন, বাঙালিরা অনেক রক্ত দিয়েছে, এবার সেই রক্ত দেওয়ার পালা শেষ করতে চায় তারা।

চক্রান্তের আভাস: বিকেলে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেন যে, শোষক চক্র প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে লিপ্ত এবং সামরিক সজ্জা বাড়িয়ে জরুরি অবস্থা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

৩. প্রশাসনিক অসহযোগ ও নতুন সংহতি

সিভিল সার্ভিসের সমর্থন: বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলার এবং আন্দোলনে শরিক হওয়ার ঘোষণা দেন।

অচলাবস্থা অব্যাহত: সচিবালয়সহ সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিসের কর্মচারীরা দশম দিনের মতো কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। তবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জনস্বার্থে ব্যাংক ও জরুরি সেবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা রাখা হয়।

৪. ছাত্র ও পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতা

মুক্তিসেনাদের সহায়তার আহ্বান: স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর ও পুলিশ সদস্যদের পাকিস্তানি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে জনগণের কাতারে আসার আহ্বান জানায়। তারা বিমানবন্দরে চেকপোস্ট বসিয়ে অবাঙালিদের দেশত্যাগ ঠোনোর হুঁশিয়ারিও দেয়।

সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ: ‘লেখক-শিল্পী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে রাজধানীর লেখক ও শিল্পীরা এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

ওয়ালী ন্যাপের পথসভা: বিকেলে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সভাপতিত্বে ঢাকা নিউ মার্কেট এলাকায় শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলার দাবিতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।

৫. চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ গঠন

১০ মার্চ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ঐতিহাসিক মোড় ঘোরে। জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী, এম এ হান্নান এবং এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ প্রথিতযশা নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ’। তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যেকোনো নির্দেশ বন্দরনগরীতে কঠোরভাবে বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেন।

৬. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিবাদ ও পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া

জাতিসংঘে স্মারকলিপি: নিউ ইয়র্কে প্রবাসী বাঙালি ছাত্ররা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারা মহাসচিব উ-থান্টের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে বাংলাদেশে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা বন্ধে জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের তৎপরতা: করাচি থেকে ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান ঘোষণা করেন যে, তিনি ১৩ মার্চ ঢাকা এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করবেন। অন্যদিকে এয়ার মার্শাল আসগর খান টেলিফোনে বঙ্গবন্ধুকে আপসের আহ্বান জানালেও বাঙালিদের মধ্যে তখন আপসের কোনো সুযোগ ছিল না।

৭. বিদেশি নাগরিকদের প্রস্থান অব্যাহত

পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল পরিস্থিতি দেখে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করে। আকাশপথে বিদেশি নাগরিকদের ঢাকা ত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়।

১০ মার্চ ১৯৭১ ছিল বাঙালির প্রশাসনিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ার একটি দিন। পাকিস্তান সরকারের অস্তিত্ব তখন কেবল সেনানিবাসের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সিভিল প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিল্পী-সাহিত্যিক—সবার কণ্ঠে তখন একটাই ধ্বনি: ‘জয় বাংলা’।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরান সংকট ও কিম জং-উনের রণকৌশল / পারমাণবিক অস্ত্রই কি সার্বভৌমত্বের একমাত্র রক্ষাকবচ?

১০ মার্চ ১৯৭১: ঘরে ঘরে স্বাধীনতার নিশান ও চক্রান্তের কালো মেঘ

৯ মার্চ ১৯৭১: উত্তাল জনসমুদ্র ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে রেমিট্যান্স সংকটের শঙ্কা: প্রবাসীদের ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার

দ্বৈত বৈষম্যের অবসান চান সাঁওতাল নারীরা

টিআইবি’র চাঞ্চল্যকর অভিযোগ / অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য গায়েব করা হয়েছে

বিডার দেড় বছর: বিনিয়োগের জোয়ার নাকি প্রচারণার বেলুন?

২০টি কুকুর হত্যা: তিন আসামির কারাদণ্ড

৮ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অচল রাজপথ, অসহযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ

৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জেগে ওঠা

১০

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি

১১

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত? / রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’

১২

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আর জিয়ার ছিয়াত্তরের ৭ মার্চ পালন—বিপরীত যাত্রা

১৩

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণের দর্শন

১৪

পর্দার আড়ালের ইতিহাস / কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

১৫

৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

১৬

৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

১৭

৭ মার্চ ১৯৭১: বাঙালির মহাকাব্য

১৮

৭ মার্চ থেকে শুরু হলো পাকিস্তানের পতন

১৯

৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

২০