
১৯৭১ সালের ৬ মার্চ, শনিবার। অসহযোগ আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে গোটা বাংলাদেশ ছিল আগ্নেয়গিরির মতো জীবন্ত। একদিকে সারা দেশে লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছিল, অন্যদিকে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু কী ঘোষণা দেবেন—তা জানতে মুখিয়ে ছিল সাত কোটি বাঙালি। এদিনই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণের মাধ্যমে চালেন তার রাজনৈতিক দাবার শেষ ঘুঁটি।
১. ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণ ও ‘২৫ মার্চ’ বিতর্ক
দুপুর ২টা ৫ মিনিটে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাওয়ালপিন্ডি থেকে জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ দেন।
অধিবেশন আহ্বান: ভাষণে তিনি ২৫ মার্চ পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।
হুমকি ও ষড়যন্ত্র: ভাষণে তিনি পূর্ব বাংলার উত্তাল পরিস্থিতি দমানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেন, "যতদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি, ততদিন নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব।"
দোষারোপ: ইয়াহিয়া অত্যন্ত চতুরভাবে পরিস্থিতির অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরোক্ষভাবে দায়ী করেন এবং আন্দোলনরত জনগণকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ হিসেবে আখ্যা দেন।
২. বঙ্গবন্ধুর জরুরি বৈঠক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ইয়াহিয়ার ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক ওয়ার্কিং কমিটির এক রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠক শুরু হয়।
কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠকে ইয়াহিয়ার ভাষণের প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করা হয় এবং পরদিন (৭ মার্চ) রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় কী কৌশলে জবাব দেওয়া হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ভাষণের প্রতিবাদে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তাৎক্ষণিক অসংখ্য মিছিল বের হয়। রাজপথ কেঁপে ওঠে স্লোগানে—‘পরিষদে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।
৩. ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিদ্রোহ
এদিন বেলা ১১টার দিকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। বন্দিরা বিদ্রোহ করে জেলের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন।
পলায়ন: ৩৪১ জন কয়েদি কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
রক্তপাত: রক্ষীদের গুলিবর্ষণে ৭ জন কয়েদি ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং ৩০ জন আহত হন। এই ঘটনা রাজধানী জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
৪. সারা দেশে রাজপথের প্রতিরোধ ও হত্যাযজ্ঞ
হরতাল চলাকালীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিকামী মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়:
রাজশাহী: মিছিলকারীদের ওপর সশস্ত্র বাহিনীর গুলিবর্ষণে ১ জন শহীদ হন এবং ১৪ জন আহত হন।
খুলনা: খুলনায় দাঙ্গা ও গুলিবর্ষণে ১৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়, আহত হন ৮৬ জন।
বেতন প্রদান: আন্দোলনের মধ্যেও সাধারণ মানুষের আর্থিক কষ্টের কথা বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত ব্যাংক ও বেসরকারি অফিসগুলো খোলা রাখা হয় শুধুমাত্র বকেয়া বেতন প্রদানের জন্য।
৫. পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
ভুট্টোর সমর্থন: পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ইয়াহিয়ার ভাষণকে স্বাগত জানান এবং ২৫ মার্চের আগেই আলোচনার মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের কাঠামো ঠিক করার দাবি তোলেন।
নূর খানের সমর্থন: কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান লাহোরে এক সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ-শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে’ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা দূর করার দাবি জানান।
টিক্কা খানের নিয়োগ: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এদিন জেনারেল ইয়াহিয়া খান ‘বাংলার কসাই’ খ্যাত লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
ভারতের নিষেধাজ্ঞা: ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম ঘোষণা করেন, ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করে পাকিস্তানি বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে (যা পাকিস্তানের জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কা ছিল)।
৬. ছাত্রসমাজের দাবি: বেতার রিলে
ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে স্পষ্ট দাবি জানান যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেন সরাসরি বেতারের মাধ্যমে সারা দেশে সম্প্রচার করা হয়। তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, সরাসরি প্রচার না করা হলে বেতারের বাঙালি কর্মচারীরা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেবেন।
৭. স্বাধীনতার পথে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা
৬ মার্চের প্রতিটি মিনিট যেন কাটছিল কয়েক ঘণ্টার সমান। সারা দেশের মানুষের কান ছিল বেতারের দিকে এবং চোখ ছিল পরের দিনের সেই ঐতিহাসিক ময়দানের দিকে। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার, মুখে মুখে স্লোগান আর রক্তে অর্জিত শপথ নিয়ে বাঙালি প্রহর গুনছিল তাদের অবিসংবাদিত নেতার চূড়ান্ত নির্দেশনার জন্য।
৬ মার্চ ছিল মূলত একটি চূড়ান্ত সংঘাতের আগের নীরবতা ও প্রস্তুতির দিন। ইয়াহিয়ার অধিবেশন ডাকার ঘোষণাকে বাংলার মানুষ ‘মরণফাঁদ’ হিসেবেই গণ্য করেছিল। এই দিনের প্রতিটি রক্তবিন্দু বাঙালির মনে স্বাধীনতার যে আগুন জ্বালিয়েছিল, তার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই—ঐতিহাসিক ৭ মার্চের জনসমুদ্রে।
তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, স্বাধীনতার দলিল, “১৯৭১ ও মুক্তিযুদ্ধ” এবং “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস” বইয়ের পাতা থেকে, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইট, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’
মন্তব্য করুন