ঢাকা মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৮ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অচল রাজপথ, অসহযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
৮ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অচল রাজপথ, অসহযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ

মুক্তির বন্দরে পৌঁছাতে বাঙালিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে রণকৌশল ঘোষণা করেছিলেন, ৮ মার্চ থেকে তা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। হাইকোর্টের বিচারক থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক—সবার অংশগ্রহণে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন দ্বিতীয় পর্যায়ে পদার্পণ করে। প্রশাসনিক কাঠামো থেকে শুরু করে সাধারণ জনজীবন, সবকিছুই চলছিলো ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের নির্দেশনায়।

বেতারজুড়ে বজ্রকণ্ঠ: আকাশবাণীতেও মুক্তির সুর

আগের দিন সামরিক জান্তার বাধার কারণে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রচার করা না গেলেও, বেতার কর্মীদের প্রবল আন্দোলনের মুখে সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে তা সম্প্রচার করা হয়। প্রদেশের অন্যান্য কেন্দ্র থেকেও এই মহাকাব্যিক ভাষণ রিলে করা হয়। এতে আবারও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে মুক্তিকামী জনতা।

১০ নির্দেশনার ব্যাখ্যা ও তাজউদ্দীন আহমদের বিবৃতি

অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন জনজীবন সচল রাখতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্বার্থে ৭ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর ১০ নির্দেশনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। নির্দেশনায় বলা হয়:

ব্যাংকিং: ব্যাংকগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। কেবল বাংলাদেশের ভেতরে লেনদেন এবং বেতন-মজুরি বাবদ সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ উত্তোলন করা যাবে।

জরুরি সেবা: বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। কৃষি কাজের স্বার্থে সার ও ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।

ডাকসেবা: পোস্ট অফিস ও সেভিংস ব্যাংকগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রলীগ ও ডাকসুর কঠোর অবস্থান: ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বর্জন

আন্দোলনের এই পর্যায়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ তাদের নামের আগে থেকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ অংশটি বর্জনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি আ স ম আব্দুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন এক যৌথ বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে জনগণকে মরণপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।

সামরিক জান্তার মিথ্যাচার ও তাজউদ্দীনের প্রতিবাদ

সরকার এক প্রেসনোটে দাবি করেছে, ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ৮ মার্চ পর্যন্ত ১৭২ জন নিহত এবং ৩৫৮ জন আহত হয়েছেন। এই তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে বলা হয়েছে। নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এখন লুটপাটের যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে, তা সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়।” তিনি সতর্ক করে বলেন, বাঙালিদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির লক্ষ্যেই পুলিশ ও ইপিআরকে দায়ী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীনতার প্রতিধ্বনি

দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশি নাগরিকেরা দ্রুত ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করেন। ৮ মার্চ যুক্তরাজ্য ও পশ্চিম জার্মানির ১৭৮ জন নাগরিক বিশেষ বিমানে ঢাকা ত্যাগ করেন। অন্যদিকে, প্রবাসেও স্বাধীনতার হাওয়া লাগে। এদিন লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে প্রায় ১০ হাজার প্রবাসী বাঙালি এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করে ‘স্বাধীন বাংলা’র দাবি তোলেন।

নিরুত্তর ভুট্টো

ইসলামাবাদে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ২৫ মার্চের অধিবেশনে যোগদানের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া চার শর্ত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি রহস্যজনক নীরবতা পালন করেন। সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

সিনেমা হলেও স্বাধীনতার আবহ

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে দেশের সিনেমা হল মালিকরা ৮ মার্চ থেকে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন বন্ধ করে দেন। তাঁরা কর না দেওয়ার কঠোর নির্দেশও স্বেচ্ছায় মেনে নেন।

বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার যে আগুন ৭ মার্চ জ্বলে উঠেছিল, তা আর কোনো সামরিক শক্তিতে নেভানো সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক (১৯৭১), বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, এবং রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী রচিত ‘৭১ এর দশ মাস’।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একটি গান, একটি সংকেত, আর ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক এক রাত / অপারেশন জ্যাকপট: রক্তে লেখা নৌ-সংগ্রামের মহাকাব্য

ভৌগোলিক বাধায় থমকে গেল ঢাকার বহু বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা / “বাংলাদেশ কখনোই আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে না”

১৭১ দিনের বেকারত্ব: প্রশিক্ষণ বিতর্কে অনড় সরকার

কীভাবে বাংলাদেশের জুলাইয়ের হতাহতের তালিকা প্রমাণ নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছিল

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে অভিযোগকারীকে আসামি এবং ভিকটিমকে বিবাদী করার অভিযোগ

জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

হাঁড়ি জ্বলছে না বাসায়, ঢাকা জুড়ে চরম গ্যাস সংকট

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম-ফেনী / হবিগঞ্জে বাধার পর সিলেটেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলা

আবু সাঈদ হত্যা / এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

‘ভারতীয় এজেন্ট’ আতঙ্ক ও শহীদ গেজেট বিতর্ক

১০

কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ: এক অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র

১১

গ্রিন ইয়ার্ডের আড়ালে রক্তের দাগ / জাহাজভাঙায় শতকোটির বিনিয়োগেও থামছে না মৃত্যু

১২

অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় শেষ হলো ‘বর্ষামঙ্গল উৎসব ১৪৩৩’

১৩

তীব্র গ্যাসসংকটে ধুঁকছে শিল্পখাত, উৎপাদনে স্থবিরতায় চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

১৪

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণকবরের দাবি একটি ‘কল্পকাহিনী’

১৫

‘টেসলা’ সমাচার: বৃষ্টি এলেই ভাড়া দ্বিগুণ, রাস্তায় নামলেই ঝুঁকি

১৬

‘জুলাই শহীদ’ গেজেটের অর্ধেক মৃত্যুই ৫ আগস্ট-এর পর

১৭

কীভাবে বাখের আলী বাংলাদেশের ‘গেজেটভুক্ত’ জুলাই শহীদ তালিকায় ‘কবির’ হয়ে গেলেন

১৮

আঁধারেই ডুবে আছে রাজধানী / বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

১৯

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

২০