

প্রাচীনকালের সম্রাট-রাজা, ধর্মবেত্তা, রাষ্ট্র বা সমরনায়কদের প্রভূত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের কথা আমাদের জানা আছে, যা যুগে যুগে নানাজনপদের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সেইসব কালজয়ী ভাষণ মানুষকে অগ্রসরতার দিকে ধাবিত করেছে। আবার এমন কিছু ভাষণ আছে যার সম্মোহনী শক্তি মানুষকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার শক্তি দিয়েছে, শৃঙ্খলিত জনপদের পরাধীনতা ঘুচিয়ে মুক্তি দিয়েছে।
অবশ্য কিছু কিছু ভাষণ আবার প্রবল প্রলয়ের সৃষ্টি করেছে, নিরন্তর সংঘাত ও রক্তপাতের কারণ হয়েছে। ১০৯৫ সালে পোপ আরবান ২-এর ক্লারমাউন্টে দেওয়া ভাষণের কথা আমরা জানি— ‘all who die …. Shall have immediate remission of sins’; এবং এটিও জানি যে, সেই ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ ক্রুসেডে নেমে পড়েছিল— যা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারত অভিযান পরিচালনা করেন। বর্তমান পাঞ্জাবের মাটিতে প্রবল পরাক্রমশালী রাজা পুরুকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডারের বাহিনী আর অগ্রসর হতে পারেনি, বড় প্রতিরোধ হতে পারে ভেবে পিছিয়ে গেছে। এই পিছিয়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ ছিল সৈন্যদের অস্বীকৃতি। বড় সেই সংকটে বাহিনীর মনোবল বাড়াতে আলেকজান্ডার এক প্রবল আবেদনময়ী ভাষণ রাখেন, যা ইতিহাসে স্মরণীয়। ১৮০৪ সালে ফরাসি বীর নেপোলিয়ন তার সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি করতে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ঠিক এমনি এক জ্বালাময়ী ও সার্থক ভাষণ রেখেছিলেন।
দাসপ্রথা বিলোপ এবং আমেরিকার সমাজে শান্তি পুনরুদ্ধারে আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালে গেটিসবার্গে যে যুগান্তকারী ভাষণ রাখেন তা বিশ্ব ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। রক্তাক্ত যুদ্ধের মৃতদের সম্মান জানিয়ে লিংকন সেদিন উচ্চারণ করেন ‘These dead shall not have died in vain’। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর সময়ে উইনস্টন চার্চিলের ভাষণ ইংল্যান্ড তথা ইউরোপে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের উদ্বোধনীতে নেতাজী সুভাষ প্রবল আবেগময় যে ভাষণটি রাখেন— ‘Comrades! You have voluntarily accepted a mission that is the noblest that the human mind can conceive of...’— তা চিরস্মরণীয়। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ‘Quit India’ ভাষণটি ভারতের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। ১৯৬১ সালে জন এফ কেনেডির বিখ্যাত ভাষণটি ছিল অনন্যসাধারণ। ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিং-এর সেই অমর ভাষণ— ‘I have a dream’-এর কথাও জানি আমরা। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত জেনারেল অগাস্টো পিনোসেটের সামরিক বাহিনী যখন সমাজবাদী সালভেদর আলেন্দেকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ওপর গোলাবর্ষণ করতে থাকে, ঠিক তখনই আলেন্দে রেডিওতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ রাখেন, যা অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে চিলির গণমানুষের কাছে। ইত্যকার যুগান্তকারী ভাষণের মধ্যেও ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি অনন্য আসনে আসীন হয়ে আছে।
কারণ এই ভাষণ বাঙালি জীবনের এক অমর মহাকাব্য, যা বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি এতটাই গুরুত্ব বহন করে যে, তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। সেই ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য দলিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম আরেক দফা বিশ্বস্বীকৃত হবার গৌরব লাভ করেছে। এই স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল, কেবল তারই স্বীকৃতি নয়; এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের গণমানুষ যে ন্যায় সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, তারও বিশ্বস্বীকৃতি। অন্যদিকে এই স্বীকৃতি সেই বাঙালি মহাপুরুষের— যিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন তার মাটি ও মানুষের জন্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণটি অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের নির্মোহ ইতিহাস ও বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস। এর তাৎপর্য নিয়ে বহুমাত্রিক মূল্যায়ন হতে পারে। প্রথমত, ভাষণটি খুবই সংক্ষিপ্ত, স্বতঃস্ফূর্ত ও তাৎক্ষণিক, মাত্র ১৯ মিনিটের মতো এবং ১,১০৭ শব্দের। প্রায় সব অর্থেই এই ভাষণ একটি ক্লাসিক সাহিত্যের মর্যাদা সম্পন্ন, যাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোতে বাঙালির জীবনের মহাকাব্য বলা যায়। এর শব্দচয়ন, আবেগ, ইতিহাসনির্ভরতা, অন্তর ও বাহিরের সংযত ও পরিপাটি ভাষা এবং ছান্দিক গ্রন্থনা একদিকে যেমন পাকিস্তানের ২৩ বছরের বাঙালি নিপীড়নের নির্মোহ ধারাবিবরণী, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মানবিক সভ্যতার প্রতি এর রচয়িতার অবিচল আস্থা ও দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ।
সে কারণে সঠিক মূল্যায়নের স্বার্থে ভাষণটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন জরুরি। একদিকে মিলিটারি শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার সেনাবাহিনী নির্বাচনী ফলাফল মানতে অস্বীকার করছে, অস্ত্রের ভাষা ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে, যত্রতত্র বাঙালিদের হত্যাও শুরু করেছে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে, ফলে গণজাগরণ তুঙ্গে উঠেছে। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব এরই মধ্যে নতুন দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়েছে, সেই পতাকা উড়ছে সারা দেশে। শুধু তাই নয়, মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে নেতার মুখ থেকে দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে। অন্যদিকে ঢাকা সেনানিবাস এলাকায় যুদ্ধবিমান ও কামান বসিয়ে অপেক্ষা করছে সরকারি বাহিনী, স্বাধীনতা ঘোষিত হলেই জনসভাতে আক্রমণ পরিচালনা করা হবে। একদিকে স্বাধীনতাকামী উত্তাল জনতা অন্যদিকে আসন্ন গণহত্যার শঙ্কা। এ পরিস্থিতিতে কী করবেন বঙ্গবন্ধু? অনুধাবনযোগ্য, জাতির পিতাকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বক্তব্য রাখতে হয়েছে, যা এক কঠিন কাজ। দ্বিতীয়ত, চরম উত্তেজক পরিস্থিতিতেও বঙ্গবন্ধু সেদিন ধৈর্য ও নিয়মতান্ত্রিকতার প্রতি অবিচল আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন। কারণ তিনি ছিলেন লক্ষ্যে অবিচল। অতএব তিনি পাকিস্তানি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণমানুষকে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দেন, যে ডাক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। ভাষণটি স্বাধীনতার কার্যকর ঘোষণা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এরপরও ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি, সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার শেষ নির্দেশনা এবং একই সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর বিক্রম ও ত্যাগের মূল উৎস। আমরা যারা ঐতিহাসিক রেসকোর্সে উপস্থিত থেকে সেদিন ভাষণটি শুনবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম, তারা জানি, কীভাবে একটিমাত্র ভাষণ গোটা জাতিকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিবাহিনীতে পরিণত করেছিল এবং যে ভাষণে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে দিয়েছিলেন।
তৃতীয়ত, এই ভাষণে পাকিস্তানের সরকারকে অকার্যকর করতে বঙ্গবন্ধু এমন এক সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, যা শান্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার বহিঃপ্রকাশ। একদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধের পথে তিনি জাতিকে প্রস্তুত করেছেন, অন্যদিকে স্বৈরশাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছেন— আর নয়, অনেক হয়েছে, এবার শেষ যুদ্ধ।
চতুর্থত, আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কেবল সময়ের চাহিদা পূরণ করেছে তাই নয়, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের চাহিদাও পূরণ করেছে। আজও যখন বাঙালিকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, আজও যখন জাতিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে পথ নির্দেশ করে, শক্তিতে বলীয়ান করে।
বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন শুদ্ধতম জাতীয়তাবাদী, মুসলমান ধর্মাবলম্বী বাঙালি অন্যদিকে আধুনিক মানুষ, যিনি পাকিস্তানি স্বৈরতন্ত্রের ২৩ বছরের মধ্যে ১৩ বছরেরও বেশি সময় কারারুদ্ধ থেকেছেন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসককূলের চরম নির্যাতনী আচরণেও তিনি ভাঙেননি, মচকাননি, পরাজিত হননি। নেতাজী সুভাষ বসুর পর তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অবিভাজিত নিষ্কলুষ যৌবন-শক্তির প্রতীক; মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানের প্রাণের মানুষ, মনের মানুষ; সব ধর্ম সব বর্ণের অধিকারবঞ্চিত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সাহসের প্রতীক। আমার উপলব্ধিতে শেখ মুজিব ধারণ করেছিলেন তিতুমীরের অমিত বিক্রম, মহাত্মা গান্ধীর সহিষ্ণু শান্তিবাদ, রবীন্দ্রনাথের প্রেম এবং সর্বভারতীয় সেনাপতি নেতাজী সুভাষের অসামান্য সাহস। লেখাটির সমাপ্তি টানার আগে অন্য একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করি। বাংলাদেশের জনকের শততম জন্মবার্ষিকীর মহা-আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। উপলক্ষটি ইতিহাসের আশীর্বাদ হোক, প্রার্থনা করি। গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে আমরা যেন সত্যিকার অর্থেই জাতির পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারি, উদযাপনের সার্থকতা খুঁজে নিতে পারি, সেটিই ছিল প্রত্যাশা। এটি তখনই সম্ভব যখন এই মহাপ্রাণের জীবন ও দর্শন নির্মোহভাবে চর্চিত হবে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু, তার কর্মময় জীবন, জয় বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ এবং ৭ মার্চের ভাষণ সময়ের আঙ্গিকে ধারণ, লালন ও চর্চা করা হবে। কারণ একটাই, জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে টেকসই করার বিকল্প কোথায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়সও অর্ধশতাব্দী পেরিয়েছে, ২০২১ সালে মহাধুমধামে আমরা উদযাপন করেছি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। আমার বিশ্বাস, এই দুই মহালগ্ন ঘিরে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক নবজাগরণ বা রেনেসাঁর সূচনা হতে পারতো, যদি আমরা জাগরিত ও ঋদ্ধ হতে পারতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয়নি বলেই আমার ধারণা। আমি যে জাগরণের কথা বলছি সেই জাগরণে অসাম্প্রদায়িক শক্তি যেমন শানিত হতে পারতো, একই সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজের মনোজগত থেকে দীনতার কালিমা অপসারণের সুযোগ তৈরি হতো।
কিন্তু তা হয়েছে কি না সে বিষয়ে আমার আশঙ্কা আছে। কয়েক যুগের ব্যবধানে লক্ষ্য করা গেছে যে, রাজনৈতিকভাবে উচ্চকণ্ঠ থাকা সত্ত্বেও আমরা সাংস্কৃতিকভাবে মুক্ত হতে পারিনি। এই দুই ঐতিহাসিক মহালগ্ন ইতিহাসের আশীর্বাদ হয়ে আমাদের দীনতা ঘুচিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আমরা তার সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছি! আমার প্রত্যাশা, নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যথার্থভাবে আসন করে নিক, রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তি মানুষ মুক্ত হোক অন্তরের কালিমা-কলঙ্ক থেকে। কিন্তু এ কাজটি যে কেবল স্লোগান দিয়েই হবার নয়; তাই প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে সত্যিকার অর্থে আত্মায় ধারণ করা, আদর্শিকভাবে ঋদ্ধ হওয়া। অন্যথায়, বেড়ে ওঠা যে অশনির পুনরাভিযান দেখছি প্রায় সর্বত্র, সাম্প্রদায়িকতার যে নবজাগরণ দেখছি, তাতে আমি শঙ্কিত। এই শঙ্কা যদি মিথ্যে হয়, বঙ্গবন্ধু ও লাখো শহীদের আত্মা শান্তি লাভ করবে। যদি তা না হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সুবিশাল অর্জন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। ভয় সেখানেই।
প্রথম প্রকাশ: সময় নিউজ, ৬ মার্চ ২০২৩
মন্তব্য করুন