
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা—এই দুই ঘটনাই উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংয়ের নীতিনির্ধারকদের ভাবনার জগতকে আমূল বদলে দিয়েছে। গত সপ্তাহে ৫ হাজার টনের বিশাল যুদ্ধজাহাজ ‘চো হিয়ন’ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর কিম জং-উন যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং এটি তার রাজনৈতিক টিকে থাকার এক চূড়ান্ত ঘোষণা।
১. ইরান ও উত্তর কোরিয়ার অভিজ্ঞতার তুলনা
বিশ্লেষকদের মতে, কিম জং-উন বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার দেজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সং সিয়ং-জংয়ের মতে, কিম এখন বিশ্বাস করছেন যে—পারমাণবিক অস্ত্র নেই বলেই ইরান আজ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিমান হামলার শিকার হচ্ছে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার গাদ্দাফির পরিণতি কিমের সামনে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে রয়েছে, যারা পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করার পর ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হয়েছিলেন।
২. উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপারি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া এখন আর কেবল ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ রাষ্ট্র নয়, বরং তারা একটি প্রতিষ্ঠিত পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান মজুদ: প্রায় ৫০টি কার্যকর পারমাণবিক ওয়ারহেড।
ভবিষ্যৎ সক্ষমতা: আরও ৪০টি ওয়ারহেড তৈরির মতো পর্যাপ্ত তেজস্ক্রিয় উপাদান (ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম) তাদের হাতে রয়েছে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: যুদ্ধজাহাজকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার প্রক্রিয়াটি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।
৩. ট্রাম্প যুগ ও কিমের ‘কূটনৈতিক ঢাল’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে উত্তর কোরিয়া অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। যদিও তারা ইরানে মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছে, কিন্তু সরাসরি ট্রাম্পের নাম নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে:
আলোচনার পথ খোলা রাখা: কিম মনে করেন, ট্রাম্প তাকে ‘পারমাণবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তিনি সুসম্পর্ক বজায় রাখতে রাজি।
ছাড় আদায়ের কৌশল: চো হান-বামের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, পিয়ংইয়ংকে এখন আর নিরস্ত্রীকরণ করা অসম্ভব। তাই কিম চাইছেন পারমাণবিক অস্ত্র হাতে রেখেই ট্রাম্পের কাছ থেকে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বড় কোনো ছাড় আদায় করতে।
৪. নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণ: রাশিয়া ও চীন ফ্যাক্টর
ইরান সংকটের এই সময়ে উত্তর কোরিয়া নিজেকে একা ভাবছে না। রাশিয়ার সঙ্গে তাদের নতুন সামরিক কৌশলগত জোট এবং চীনের মৌন সমর্থন কিম জং-উনকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এই জোটবদ্ধতা তাকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় এক ধরনের ‘নিরাপত্তা বলয়’ প্রদান করছে।
৫. সম্ভাব্য ট্রাম্প-কিম বৈঠক ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
চলতি মাসের শেষে ট্রাম্পের চীন সফরের সময় কিম জং-উনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের গুঞ্জন রয়েছে। তবে এবারের বৈঠক ২০১৮ সালের সিঙ্গাপুর বা ২০১৯ সালের হ্যানয় বৈঠকের মতো হবে না।
শর্তহীন স্বীকৃতি: কিম এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন।
নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা: উত্তর কোরিয়ার কাছে এখন এটি স্পষ্ট যে—আলোচনা বা কূটনীতি নয়, বরং প্রকৃত ‘পারমাণবিক মালিকানাই’ জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি।
ইরানে ইসরায়েল-মার্কিন হামলা উত্তর কোরিয়ার জন্য একটি ‘আই-ওপেনার’ বা চোখ খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা। পিয়ংইয়ংয়ের বার্তা পরিষ্কার: তারা আর নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটবে না। বরং বিশ্বের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রকেই তারা তাদের সার্বভৌমত্বের একমাত্র রক্ষাকবচ হিসেবে বেছে নিয়েছে।
মন্তব্য করুন