ঢাকা সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

সম্পাদকীয়
০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:২৪ এএম
০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৫ এএম
৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

বাঙালি জাতির ইতিহাসের কালপঞ্জিতে ৭ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং মুক্তি কামনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত দীর্ঘ বঞ্চনা ও শোষণের যে পাহাড় জমেছিল, ১৯৭১ সালের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৮ মিনিটের সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠ তাকে তছনছ করে দিয়েছিল। সেই ভাষণ ছিল একাধারে রণকৌশল, রাজনৈতিক দর্শন এবং স্বাধীনতার অলিখিত ঘোষণা।

বঙ্গবন্ধুর সেই ডাক—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—নিছক কোনো আবেগীয় উচ্চারণ ছিল না। এটি ছিল নিরস্ত্র এক জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করার এক সুনিপুণ কৌশল। বিশ্বখ্যাত সাময়িকী নিউজউইক তাই তাকে যথাযথভাবেই ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো যখন এই ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন তা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং সারাবিশ্বের শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের সম্পদে পরিণত হয়।

তবে সময়ের আবর্তে রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চের রাষ্ট্রীয় উদযাপন ও ছুটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালেও দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি। পাঠ্যবই থেকে এই ভাষণের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক ও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। এটি অনস্বীকার্য যে, গত দেড় দশকে ৭ মার্চের ঐতিহাসিকতাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমার্থক করে ফেলার এক ধরণের চেষ্টা চলেছে, যা জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।

কিন্তু রাজনীতির পালাবদলে দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা উদযাপনের ধরনে পরিবর্তন এলেও, ১৯৭১-এর সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এই ভাষণের গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে রণক্ষেত্রে টেনে আনার পেছনে ৭ মার্চের যে মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা ছিল, তা ইতিহাসের এক অক্ষয় সত্য।

বর্তমান গণতান্ত্রিক আবহে ইতিহাসকে নির্মোহভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৭ মার্চ কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এটি বাঙালির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র দিবসটি পালন করুক বা না করুক, ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল মার্চে বাঙালির হৃদয়ে যে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র উপ্ত হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান থাকবে। নতুন প্রজন্মের উচিত রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক ও মহানায়ককে তাদের প্রকৃত অবদানের নিরিখে মূল্যায়ন করা। শৃঙ্খলমুক্তির সেই অবিনাশী আহ্বান যেন রাজনৈতিক সংকীর্ণতায় ম্লান না হয়—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নীতি-ভুলের খেসারত / মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৩০ লাখ শিশু, ফিরছে নির্মূল হওয়া রোগ

১৯ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী সরকারের শাসনতান্ত্রিক নির্দেশনা ও রণক্ষেত্রে রক্তের দাগ

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও মুজিবনগর সরকার

মুজিবনগর দিবস: এক অমর ইতিহাসের মহাকাব্য

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১০

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১১

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১২

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

১৩

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৪

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১৫

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১৬

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১৭

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১৮

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১৯

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২০