ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

সম্পাদকীয়
০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:২৪ এএম
০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৫ এএম
৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

বাঙালি জাতির ইতিহাসের কালপঞ্জিতে ৭ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং মুক্তি কামনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত দীর্ঘ বঞ্চনা ও শোষণের যে পাহাড় জমেছিল, ১৯৭১ সালের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৮ মিনিটের সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠ তাকে তছনছ করে দিয়েছিল। সেই ভাষণ ছিল একাধারে রণকৌশল, রাজনৈতিক দর্শন এবং স্বাধীনতার অলিখিত ঘোষণা।

বঙ্গবন্ধুর সেই ডাক—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—নিছক কোনো আবেগীয় উচ্চারণ ছিল না। এটি ছিল নিরস্ত্র এক জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করার এক সুনিপুণ কৌশল। বিশ্বখ্যাত সাময়িকী নিউজউইক তাই তাকে যথাযথভাবেই ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো যখন এই ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন তা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং সারাবিশ্বের শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের সম্পদে পরিণত হয়।

তবে সময়ের আবর্তে রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চের রাষ্ট্রীয় উদযাপন ও ছুটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালেও দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি। পাঠ্যবই থেকে এই ভাষণের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক ও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। এটি অনস্বীকার্য যে, গত দেড় দশকে ৭ মার্চের ঐতিহাসিকতাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমার্থক করে ফেলার এক ধরণের চেষ্টা চলেছে, যা জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।

কিন্তু রাজনীতির পালাবদলে দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা উদযাপনের ধরনে পরিবর্তন এলেও, ১৯৭১-এর সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এই ভাষণের গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে রণক্ষেত্রে টেনে আনার পেছনে ৭ মার্চের যে মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা ছিল, তা ইতিহাসের এক অক্ষয় সত্য।

বর্তমান গণতান্ত্রিক আবহে ইতিহাসকে নির্মোহভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৭ মার্চ কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এটি বাঙালির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র দিবসটি পালন করুক বা না করুক, ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল মার্চে বাঙালির হৃদয়ে যে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র উপ্ত হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান থাকবে। নতুন প্রজন্মের উচিত রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক ও মহানায়ককে তাদের প্রকৃত অবদানের নিরিখে মূল্যায়ন করা। শৃঙ্খলমুক্তির সেই অবিনাশী আহ্বান যেন রাজনৈতিক সংকীর্ণতায় ম্লান না হয়—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

শেখ জামাল: এক অকুতোভয় বীর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকার

নতুন সরকারের আড়াই মাসে ১ হাজার ১৩০টি হত্যা-ধর্ষণ মামলা

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরে শুরু হলো ইউরেনিয়াম লোডিং

ফজলুর রহমানের মন্তব্যে তোলপাড় সংসদ / শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতের রাজনীতি করা অসম্ভব

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

১০

পুলিশি বাধায় পিছু হটেননি সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা / নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি

১১

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক মির্জা ফখরুলের

১২

মুক্তিযুদ্ধের দলিলচিত্রের রূপকার কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

১৩

২৬ এপ্রিল ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল

১৪

ইউনূসের ১৮ মাস / অর্থনীতির গভীর ক্ষত ও এক ‘ফোকলা’ উত্তরাধিকারের খতিয়ান

১৫

তপ্ত জনপদে অন্ধকারের শাসন

১৬

জয়পুরহাটের পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যায় আজও আতঙ্কিত স্বজনহারা পরিবার

১৭

২৫ এপ্রিল ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমীকরণ

১৮

২৪ এপ্রিল ১৯৭১: সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম

১৯

২২ এপ্রিল ১৯৭১: মুক্তির বারুদ আর পৈশাচিকতার কালো ছায়া

২০