

ঝিনাইদহ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গল্প নয়; এটি বীরত্বের সেই সব মুহূর্তের সমষ্টি, যা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ঝিনাইদহের মাটিতে রচিত হয়েছিল এমনই এক বীরত্বগাথা। সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে নির্মিত হয়েছিল ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’, যা আজ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতিরোধের সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ। ঢাকা যখন উত্তাল, তখন ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ ও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন অতর্কিত প্রতিরোধ। ইতিহাসবিদদের মতে, ২৫ মার্চের কালরাত্রির আগেই ঝিনাইদহের বীর সন্তানেরা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। মহিষাকুণ্ডুর এই মোড়টি হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী মানুষের মিলনস্থল। সেই অকুতোভয় প্রতিরোধের স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই নির্মিত হয় এই স্মারক ভাস্কর্য।
ভাস্কর্যের গঠন ও তাৎপর্য
ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের মহিষাকুণ্ডু মোড়ে অবস্থিত এই ফলকটি স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে অত্যন্ত অর্থবহ। এর মূল কাঠামোর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে মুক্তিপাগল মানুষের একতাবদ্ধ শক্তিকে। এটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্তম্ভ নয়, বরং ঝিনাইদহবাসীর অদম্য সাহস আর ত্যাগের প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন এবং ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ান ইতিহাসের এই মূর্ত প্রতীকের সামনে।
বর্তমান অবস্থা ও স্থানীয়দের দাবি
সরেজমিনে দেখা যায়, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভাস্কর্যটির সৌন্দর্য কিছুটা ম্লান হয়েছে। ফলকের চারপাশের এলাকা অনেক সময় দখল ও ময়লা-আবর্জনার কবলে পড়ে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই ভাস্কর্যটি আমাদের অহংকার। কিন্তু সঠিক প্রচার ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নতুন প্রজন্ম এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি জানতে পারছে না।"
শহরবাসীর দাবি, এই স্মারক ফলকটিকে ঘিরে একটি দৃষ্টিনন্দন চত্বর এবং এর ইতিহাস সংবলিত একটি সংক্ষিপ্ত ফলক স্থাপন করা হোক। এতে করে পর্যটক এবং শিক্ষার্থীরা আমাদের স্থানীয় গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিকের সেই গৌরবময় প্রতিরোধ কেবল ঝিনাইদহের নয়, সারা বাংলাদেশের সম্পদ। ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’ সংরক্ষণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ইতিহাসের এই স্মারকটি যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে বীর শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করা এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন