

ব্রিটিশ শাসনামল ভারতীয়দের জন্য পরাধীনতার দীর্ঘতর যুগ। পাশাপাশি এখানকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের যুগও এটি। বিশেষ করে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাগরিক জীবনে ব্যাপক পালাবদল হয়। এ পালাবদল বাঙালিদেরও প্রভাবিত করে। বাঙালি সমাজে তখনো বাবুর কালচার বা সমাজের উচ্চবর্ণের প্রভাব ছিল। অন্যদিকে ছিলেন নব্যশিক্ষিত ও ব্রিটিশ শিক্ষায় প্রভাবিত নাগরিক সমাজ। এরা ছিল নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ সচেতন অংশ, যারা সমাজের বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের কুসংস্কারগুলো ভাঙতে চেষ্টা করেছেন।
একদিকে পরাধীনতা। অন্যদিকে সামাজিক ব্যাপক পরিবর্তন চলমান। ঠিক ওই সময় সমাজে বাঙালি নারীদের অবস্থা কেমন ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, উনিশ শতকের শুরুতে ‘নারী’ প্রশ্নটি ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তবে সেটা নেতিবাচক অর্থে। যেমন প্রভাবশালী ব্রিটিশ লেখকরা ভারতীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজকে নিকৃষ্ট বলে নিন্দা করে নারীদের প্রতি যে আচরণ করা হয় সে বিষয়টি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায় নারীরা ছিল অসহায়। অশিক্ষা, অসহনীয় প্রচলিত প্রথা যেমন কৌলিন্য প্রথা, বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ এগুলো ছিল সমকালীন সমাজে নারীর প্রতি অন্যায় আচরণের অন্যতম উদাহরণ। আরো মারাত্মক প্রথা ছিল জ্বলন্ত আগুনে মৃত স্বামীর সঙ্গে সহমরণের কুখ্যাত সংস্কৃতি ‘সতীদাহ প্রথা’।
যেখানে অন্ধকার সেখানেই একসময় আলো জ্বলে। উনিশ শতকে নারীর নতুন আলোর বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হন দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সে সময় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু বিধবা নারীদের মর্যাদাকে উন্নতকরণ এবং পুনর্বিবাহকে উৎসাহদান, নারীশিক্ষাকে সমর্থন ও পুরুষের বহুবিবাহ বন্ধ করতে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন। ১৮২৯ সালে ব্রিটিশরা সতীদাহকে বেআইনি ঘোষণা করে এবং ১৮৫৬ সালে বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইন পাস করে। তবু সতীদাহ প্রথা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যায়নি, কোথাও কোথাও চলমান ছিল।
এ সময় মেয়েদের স্কুলমুখী করার প্রচেষ্টা নারীর অগ্রগতির বড় মাইলফলক। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত ও বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ‘বাংলাপিডিয়া’ থেকে জানা যায়, বাংলায় মেয়েদের স্কুল প্রথম চালু করেন মিশনারিরা; ১৮১৯ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশন ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইট’ গঠন করে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘সম্ভ্রান্ত’ হিন্দু বালিকাদের জন্য চার্চ মিশনারি সোসাইটি কর্তৃক ৩০ টিরও অধিক স্কুল খোলা হয়। ১৮২৪ সাল নাগাদ ঢাকায় একটি খ্রিস্টান মহিলা স্কুল শুরু করা হয়, কিন্তু ১৮২৬ সালে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েদের বিখ্যাত স্কুলগুলোর অন্যতম বিদ্যালয় ছিল ১৮৪৯ সালে কলকাতায় জে.ই ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়। ১৮৫০ সাল নাগাদ এর ছাত্রীসংখ্যা দাঁড়ায় ৮০। ১৮৫৪ সালে সরকার অনুদানের মাধ্যমে নারীশিক্ষাকে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করা হয়। ওই বছর মেয়েদের জন্য বাংলায় মোট ২৮৮টি স্কুল ছিল। ১৮৭৮ সালে ‘নারী-মুক্তি’ র প্রশ্নে এটি বিভক্ত হয়ে যায় এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রগতিশীল শাখা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠা করে।
পূর্ববঙ্গেও নারীশিক্ষা ও নারীর অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা দেখা যায়। সেটি কুমিল্লায়। কুমিল্লার লাকসামের সম্ভ্রান্ত এক ভূস্বামীর মালিকের কন্যা নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪-১৯০৩) ১৮৭৩ সালে কুমিল্লায় প্রথম মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিশ শতকের আগে এ ধরনের বিদ্যালয়ে মুসলমান মেয়েরা যোগদান করেনি। হিন্দুর নারীরাই ছিল শিক্ষার্থী। বিশ শতকে মুসলিম পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এগিয়ে আসে। তবে সেটা সংখ্যায় কম। মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন ঘরের মেয়েরা পড়তে আসত। গরিব বা সাধারণ পরিবারের মেয়েরা ছিল পিছিয়ে।
সচেতন ও সংস্কারবাদী উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় উনিশ শতকে নারীশিক্ষার সামান্যই অগ্রগতি হয়। কিন্তু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। শিক্ষার আলোয় আলোকিত নারীরা ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর কর্মজীবনে প্রবেশ করতে শুরু করেন। শুরুর দিকে এরই গুরুত্বপূ্র্ণ পর্ব হলো ‘বাঙালি নারীর বিদেশযাত্রা’। যদিও তখনো সমাজের নানা বিধি, কুসংস্কার চলমান ছিল। যেমন সাগর পার হলে জাত চলে যাওয়া এসব। তার পরও নারীরা বাঁধার শিকল ভেঙে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।
অবশ্য বাঙালি নারীর প্রথমদিককার বিদেশ ভ্রমণটা হয়েছে পুরুষের তত্ত্বাবধানে। ব্রিটেনে পা রাখা প্রথম বাঙালি নারী শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতবন্ধু মেরি কার্পেন্টার ভারতে বেড়ানোর সময় শশীপদকে সস্ত্রীক ইংল্যান্ডে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণে ১৮৭১ সালের ১৯ এপ্রিল তিন শিশুসন্তানকে রেখে রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ওলগা’ নামে জাহাজে করে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হন। তখন অবশ্য জাহাজ ছাড়া ব্রিটেনে যাওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। শশীপদ ও রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়। সে বছরের মে মাসের শেষে তারা ব্রিটেনের ব্রিস্টলের মেরি কার্পেন্টারের বাসায় ওঠেন। এর মাধ্যমে প্রথম কোনো বাঙালি নারীর ব্রিটেনে যাওয়ার সূচনা হয়। রাজকুমারীর ইংরেজি জানা ছিল না। তাই সেখানে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার অনেক কষ্ট করতে হয়। কথাবার্তা ভাষায় নয়, হতো আকার-ইঙ্গিতে। স্বামীর সঙ্গে প্রায় আট মাস ব্রিটেনে বাস করেন রাজকুমারী। তিনি গর্ভবতী ছিলেন। বসবাসকালে তিনি সেখানে এক ছেলের জন্ম দেন।
এরপর ১৮৭৭ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী স্বামীকে ছাড়াই ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হন। সঙ্গে নেন ছয় বছর বয়সী ছেলে, চার বছর বয়সী মেয়ে ও গৃহকর্মী রামকে। ব্রিটেনে তিনি আড়াই বছর ছিলেন। সেখানে বিদেশী কুকুর পুষেছিলেন। ফরাসি ভাষা শেখেন। সন্তানদের নিয়ে সাগরপাড়ে বেড়াতেন। কিছুটা ইংরেজি জানতেন। কবিতা আবৃত্তির প্রতি আগ্রহ ছিল, করতেনও। ব্রিটেনে বসবাসকালেই স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দেবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেখানে গিয়েছিলেন।
উনিশ শতকে প্রখ্যাত নারীবাদী লেখিকা ও সমাজসেবক ছিলেন কৃষ্ণভাবিনী দাস। বউবাজারের বিখ্যাত শ্রীনাথ দাসের ছেলে দেবেন্দ্র দাসের সঙ্গে ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। দেবেন্দ্র দাস ব্রিটেনে লেখাপড়া ও বসবাস করতেন। ১৮৮২ সালে দেশে এসে কিছুদিন থাকেন। এরপর স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনীকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিটেনে যান। তখন কৃষ্ণার বয়স ছিল ১৮-এর কম। জ্ঞানপিপাসু কৃষ্ণভাবিনী সেখানকার সমাজ ও বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ইংল্যান্ডের নারীদের মুক্ত জীবন দেখে মুগ্ধ হন। পরে ব্রিটেনে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন ‘ইংল্যান্ডে বঙ্গ-মহিলা ১৮৮৫’ শীর্ষক গ্রন্থ। গ্রন্থে তিনি ইংরেজ নারীদের স্বাধীনতা, শিক্ষা, কর্মজীবন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। ইংল্যান্ডে তখনো নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। উল্লেখ্য যে বাঙালি নারীর গ্রন্থ লেখার বিষয়টি তখনো প্রচলিত ছিল না। তাই তিনি সরাসরি নিজের নাম ব্যবহার করেননি।
১৮৮৩ সালে কাদম্বিনী বসু গঙ্গোপাধ্যায় ও চন্দ্রমুখী বসু বিখ্যাত বেথুন কলেজের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন। এ দুজন ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট। পরে কাদম্বিনী বসু পাঁচ বছর মেডিকেলে পড়াশোনা করেন। ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে এক বছর পরে এলআরসিপি (এডিনবরা), এলআরসিএস (গ্লাসগো), ডিএফপিএস (ডাবলিন) ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরেন। তিনি প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে পাশ্চাত্য নিয়মে চিকিৎসা করার অনুমতি পান।
বাংলাদেশের সন্তান স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী। এ ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী ছিলেন পরাধীন ভারতবর্ষে জন্ম নেয়া শত শত স্বদেশপ্রেমিকের মধ্যে অন্যতম। ১৯০০ সালে স্বামী জগদীশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে ইংল্যান্ডে যান স্ত্রী অবলা বসু। স্বামীর সঙ্গে বিজ্ঞান সভার গ্যালারিতে উপস্থিতি, নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থা, প্রথম লিফটে ওঠা— এসব অভিজ্ঞতায় বিস্মিত ও মুগ্ধ হন অবলা।
কুচবিহারের রাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের স্ত্রী ছিলেন সুনীতি দেবী; তিনি প্রখ্যাত ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের মেয়ে। ১৮৯৭ সালে ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহণের হীরকজয়ন্তী উৎসবে যোগদানের জন্য ব্রিটেনে যান সুনীতি। সুনীতি দেবী প্রায় তিন বছর স্বামীর সঙ্গে ইংল্যান্ডে ছিলেন। সেখানকার অভিজাত শ্রেণীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে সিআইই উপাধি পান।
ওপরে বর্ণিত নারীদের সবাই ব্রিটেনে ভ্রমণে যান সমুদ্রপথে, জাহাজে করে। কিন্তু প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজে চড়ে ইংল্যান্ডে যান কবি মৃণালিনী সেন। মৃণালিনীর দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল কেশবচন্দ্রের দ্বিতীয় পুত্র নির্মল চন্দ্র সেনের সঙ্গে। নির্মল সেনের সান্নিধ্যেই মৃণালিনীর প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল। নির্মল সেন ছিলেন ইন্ডিয়া অফিসের ভারতীয় ছাত্রদের শিক্ষা উপদেষ্টা। মৃণালিনী স্বামীর কর্মস্থল ইংল্যান্ডে প্রথমবার যান ১৯০৯ সালে। পরে ১৯১৩-৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি সেখানে বাস করেন। মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবায় ‘অ্যাম্বুলেন্স কোর’ গঠন করলে মৃণালিনীও সে কাজে যুক্ত হন। এ সময় গান্ধীজি মৃণালিনীর কাছে বাংলা ভাষা শেখেন।
মৃণালিনী ইংল্যান্ডে বসেই লেখালেখি করেন এবং খ্যাতি অর্জন করেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে ‘দ্য পোয়েট রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ প্রবন্ধ লিখে পশ্চিমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে আরো পরিচিত করেন।
বাঙালি নারীর বিলাতযাত্রার প্রভাব: কলকাতার দেশবন্ধু গার্লস কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক কথিকা রায় ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারীদের বিদেশযাত্রা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারীরা স্বল্প বা দীর্ঘসময় বিদেশ ভ্রমণের প্রভাবে নিজেদের মনন, চিন্তা, বাস্তবতা ও নিজেদের পরিচিতি অনুসন্ধানে তৎপর হয়ে ওঠেন। অপরিচিত জগৎ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা তাদের চিন্তার বিকাশে সহায়তা করে। বিদেশী প্রসারিত সমাজ ব্যবস্থা ও উদার শিক্ষাপদ্ধতি দেখে নিজের দেশের পশ্চাৎপদতাকে গভীরভাবে অনুভব করেন। যদিও এ ভ্রমণগুলো তারা পুরুষের সঙ্গী হিসেবে করেছেন, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের ধরনটি ছিল একান্তই নিজস্ব। বিভিন্ন কুসংস্কার ও সামাজিক বাধায় আবদ্ধ বাঙালি নারীদের বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, প্রয়োজনভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চিরাচরিত জাতি, ধর্ম, বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর মানবিক সত্তায় উত্তরণে সহায়ক ছিল এ ভ্রমণযাত্রা।
ঔপনিবেশিক আমলে নারীর নিষ্ঠুরতম প্রথা ‘সতীদাহ’ উচ্ছেদ হয়েছে, নারীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে। কিন্তু এটি বাঙালি সমাজের সর্বাঙ্গে হয়নি। অধিকাংশ সমাজে অবরুদ্ধ নারীরা সেভাবে ঘর থেকেও বের হতে পারেনি। এর একটি চিত্র পাওয়া যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প, উপন্যাস ও নাটকের চরিত্রে। বিংশ শতাব্দীতে বিদ্রোহী কবি নজরুলের লেখার মধ্যেও পাওয়া যায় সমকালীন নারীর অসহায়ত্বের নানা চিত্র।
আজকের দিনে বাঙালি নারীদের বিদেশযাত্রা অনেক বেড়েছে। অবশ্য এখন শুধু লেখাপড়ার জন্য বা স্বামীর সঙ্গী হিসেবেই নয়, অনেক নারী শ্রমিক হিসেবে বিদেশ যাচ্ছেন। কিন্তু সেটা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। তাই বলা যায়, বাঙালির নারীর যে অগ্রগতি, তার গুরুত্বপূ্র্ণ ধাপ- ঔপনিবেশিক আমলে নারীর বিদেশযাত্রা। বিভিন্ন কাল পেরিয়ে নারীর সে অগ্রগতির ধাপ আজও চলমান।
তথ্যসূত্র
১. অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশে এশিয়াটিক সোসাইটি, ভুক্তি: নারী।
২. কথিকা রায়, বঙ্গমহিলাদের বিদেশযাত্রা: ঔপনিবেশিক বাংলায় নারী আধুনিকতার বিশেষ এক অধ্যায়, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স স্টাডিজ, ভলিয়ম ৭, ইস্যু ৩, ২০২১, আসাম (ভারত), স্কলার পাবলিকেশন্স, পৃ. ৭৭-৮৩।
৩. কৃষ্ণা গুহ রায়, সেকালে বঙ্গ ললনাদের বিলাত ভ্রমণ, samoyiki.com, ৬ মে ২০২৫।
৪. মোছা রূপালী খাতুন, পূর্ব বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর ভূমিকা, জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্টস, ভলিউম ৯, জানুয়ারি-জুন ২০১৯, পৃ. ১১৩-১৪।
মন্তব্য করুন