
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি সাক্ষর করেছে যে চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে এখন ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করার বিনিময়ে মার্কিন শুল্ক হ্রাসের ব্যবস্থা করে। কিন্তু চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায় বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি পুনর্বিবেচনার নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে ।
চুক্তির মূল শর্তাবলী
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনে। এর বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা বা মন-মেড ফাইবার ব্যবহার করে তৈরি নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক শূন্য শুল্কে আমেরিকায় রপ্তানির সুযোগ পাবে বাংলাদেশ । বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা, ভুট্টা) আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন জ্বালানি ও বিমান কেনার অঙ্গীকার করে ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ তার খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি বাজার উন্মুক্ত করে দেয়। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ মার্কিন দুগ্ধ, মাংস ও হাঁস-মুরজি খাতের জন্য বাজার প্রবেশের পথ সুগম করে এবং কৃষি জৈবপ্রযুক্তি পণ্য আমদানিতে সম্মত হয়, যেখানে জিএমও পণ্যের জন্য আলাদা লেবেলিংয়ের প্রয়োজন হবে না ।
কৃষিখাতের জন্য হুমকি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, কৃষিখাত জিডিপিতে প্রায় ১১.১৯ শতাংশ অবদান রাখে এবং দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর জীবিকা নির্বাহ করে । প্রাণিসম্পদ খাত দেশের প্রায় ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং পরোক্ষভাবে অর্ধেকের বেশি মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত । ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৫ কোটি ৬৭ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং ৩৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি হাঁস-মুরগি ছিল ।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ শাহ এমরান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বিদেশি পণ্যের ব্যাপক প্রবেশ দেশীয় দুগ্ধ খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা ইতিমধ্যেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সংগ্রাম করছে । বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশাল ভর্তুকি নির্ভর মার্কিন কৃষি শিল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের প্রতিযোগিতা করা প্রায় অসম্ভব।
জিএমও পণ্যের অনুপ্রবেশ
চুক্তির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিকটি হলো জৈবপ্রযুক্তি পণ্যের বিষয়টি। বাংলাদেশ মার্কিন জৈবপ্রযুক্তি পণ্যের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেবে এবং ২৪ মাসের মধ্যে মার্কিন জিএমও পণ্য আমদানি ও বিপণনের নীতি প্রণয়ন করতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের জন্য আলাদা কোনো প্রাক-বাজার পর্যালোচনা, বাড়তি লেবেলিং বা স্থানীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না । এর ফলে সয়াবিন, তেলসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে জিএমও-এর উপস্থিতি সম্পর্কে ভোক্তারা অজ্ঞাত থাকবেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এই প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বায়োটেকনোলজি পণ্য যেমন সয়াবিন ও তেল ইতিমধ্যেই সঠিক লেবেল ছাড়া আমদানি করা হচ্ছে ।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নতুন সম্ভাবনা
চুক্তি স্বাক্ষরের দুই সপ্তাহ না যেতেই যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায়ে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী শুল্ক আরোপের পদ্ধতিকে 'অবৈধ' ঘোষণা করে। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প নতুন পথ বেছে নিয়ে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের 'সেকশন ১২২' প্রয়োগ করে বিশ্বের সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা পরবর্তীতে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয় ।
এই পরিস্থিতিতে ৯ ফেব্রুয়ারির বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল 'পাল্টা শুল্ক' (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) ব্যবস্থা। যেহেতু সেই শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তিই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে খারিজ হয়ে গেছে, তাই চুক্তিটির যৌক্তিকতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, দুই দেশের সংসদে অনুসমর্থনের প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন না হওয়ায় চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি, যা বাংলাদেশকে পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ দিয়েছে ।
বাণিজ্যচুক্তি বনাম নতুন শুল্কের সমীকরণ
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ১৫ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের জন্য দ্বৈত প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ১৯ শতাংশ শুল্কের সুবিধা পেতে যাচ্ছিল, অন্যদিকে নতুন সর্বজনীন শুল্কে তা আরও জটিল হচ্ছে। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চুক্তিটি হয়তো বাতিল হয়ে যেতে পারে। তবে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়, ২৪ ফেব্রুয়ারির পরই প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক আইনি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ এসেছে। চুক্তিটি এখনো কার্যকর না হওয়ায় এবং এর আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন সরকারকে কৌশলী হতে হবে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খানের পরামর্শ, পুরো বিষয়টি নতুন করে দেখার সুযোগ আছে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে।
নতুন সরকারের করণীয় হতে পারে-
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষরের তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছেই। এই চুক্তি যদি দেশের স্বার্থের অনুকূল না-ই হয়, তাহলে এই তাড়াহুড়ো ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণা ও মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশের জন্য ৯ ফেব্রুয়ারির বাণিজ্যচুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার একটি কূটনৈতিক ও আইনি পথ খুলে দিয়েছে। এই চুক্তি বাংলাদেশের কৃষিখাতের জন্য একটি ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করতে পারত, যা দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করে ভর্তুকি নির্ভর মার্কিন পণ্যের বাজার তৈরি করে দিত। নতুন সরকারকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃষিখাতের স্বার্থ ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সবার ওপরে রেখে কৌশলী বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করতে হবে।
মন্তব্য করুন