

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে শিশু হত্যা এবং চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ক্রমবর্ধমান এই অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) নতুন করে সব থানাকে নির্দেশনা প্রদান করেছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এম নজরুল ইসলাম ২২ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) গণমাধ্যমকে জানান, কিশোর গ্যাং চক্রের অপরাধ দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। তাদের দমন করতে নতুন করে অভিযান শুরু হয়েছে এবং অপরাধীদের নিয়মিত আটক ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সর্বশেষ আদাবরে চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত চার বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ধর্ষণসহ কয়েক হাজার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় এখনো ১২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের নথিতে উল্লেখ আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব থানায় অভিযান অব্যাহত থাকলেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো সম্ভব হয়নি।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় দেশের সব পুলিশ ইউনিটপ্রধান, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবার প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে হবে।”
আদাবরে চাঁদাবাজি ও হামলা: গত শনিবার রাজধানীর আদাবর এলাকায় একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় কিশোর গ্যাং চক্রের দলনেতা ‘কালা’ রাসেলের নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র সদস্য ঈদকে সামনে রেখে চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা কারখানায় হামলা চালিয়ে কয়েকজন শ্রমিককে কুপিয়ে আহত করে। ঘটনার প্রতিবাদে ওই রাতে দেড় শতাধিক লোক আদাবর থানা ঘেরাও করে। ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত রাসেল ও তার সহযোগীসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থী হত্যা: যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে ছুরি মেরে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কাজলা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত মাহিম মিয়া (১৫) স্থানীয় একটি মাদরাসার ছাত্র ছিল। যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজুল ইসলাম জানান, এই হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় কিশোর গ্যাং জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে এবং অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর অপরাধ দেশের জন্য মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যে বয়সে লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ার কথা, সেই বয়সেই একটি বড় অংশ অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ কিশোর অপরাধী দারিদ্র্যের কারণে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। এছাড়া পারিবারিক কলহ, মা-বাবার অবহেলা, মাদকাসক্তি, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে ৫৫০টি সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ জানান, বিএনপি বা সরকারদলীয় পরিচয়ে কাউকে চাঁদাবাজির সুযোগ দেওয়া হবে না। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন