ঢাকা রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

মেয়ে ও তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে পলিথিনের ঘরে থাকেন তফুরা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫, ০৪:৩২ পিএম
মেয়ে ও তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে পলিথিনের ঘরে তফুরা

মেয়ে ও তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মাঠের মাঝখানে পলিথিনের তৈরি ঘরে বসবাস করছেন বিধবা তফুরা বেগম। পলিথিনের এই ঘরটি মাঠের মাঝখানে হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। পলিথিন নিচে থাকার ব্যবস্থা হলেও সেখানে নেই কোনো টিউবওয়েল ও টয়লেট। এসব কাজ সারতে হয় প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে। সব মিলে কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়েও দিন পার করতে হচ্ছে ৫ সদস্যের এই পরিবারটিকে।

বর্তমানে তিনি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের জেমজুট মুসলিমবাগ এলাকার বাসিন্দা। তফুরার স্বামী সৈয়দ আলীর বাড়ি পঞ্চগড় পৌর শহরের তেলিপাড়া এলাকায়। কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। সৈয়দ আলী তফুরাকে বিয়ে করার পর আরও দুটি বিয়ে করেন। এরপর তাদের সংসারে শুরু হয় অশান্তি।

২০০৬ সালে তফুরা তার মেয়েকে নিয়ে চলে আসেন জেমজুট এলাকায়। সেখানে বাড়িভাড়া নিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর মেয়ে শরিফা খাতুনকে বিয়ে দেন। সেখানে তার ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি শরিফার। পরে পঞ্চগড়ের সাঁকোয়া এলাকায় আবারও বিয়ে করেন শরিফা। সেই সংসারে তার আরেকটি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সন্তান জন্মগ্রহণ করার কিছুদিন পরে তার ২য় স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে যায়। তখন থেকে শরিফা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

পরে তফুরা বেগম মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে ও তিন নাতি নাতনিকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালান। এদিকে মেয়ে মানসিকভাবে বেশি অসুস্থ হওয়ার কারণে অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট করতে থাকে। এসব ঘটনায় সবাই বিরক্ত হয়ে তাদেরকে ভাড়া বাসা থেকে বের করে দেয়। কোথাও কোনো থাকার জায়গা না থাকায় দানদিঘী ইউনিয়নের জেমজুট মুসলিমবাগ এলাকায় স্থানীয়রা পলিথিন দিয়ে একটি তাবু তৈরি করে দেয়। বর্তমানে সেই তাবুতে তিন মাস ধরে বসবাস করছেন তারা।

তফুরার নাতি নয়ন ইসলাম জানায়, আমার নানি ভিক্ষা করে সংসার চালায়। এই ঘরটা এলাকার লোকজন নিজেরাই টাকা খরচ করে তুলে দিয়েছে। এখানে আমরা ৫ জন বসবাস করি। থাকতে খুব কষ্ট হয়।

তফুরা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। কয়েকমাস ধরে তার মাথায় সমস্যা হওয়ায় অন্য ভাড়াটিয়াদের কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট করছে। তাই তারা ভাড়া বাড়িতে থাকতে দিচ্ছে না। আমার তো কোনো জমি জায়গা নেই। এলাকার লোকজন স্থানীয় জসিম উদ্দিন নামে একজনের জমিতে পলিথিন দিয়ে আমাকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে কোনো টিউবওয়েল নাই। কষ্ট করে দূর থেকে পানি নিয়ে এসে গোসল করতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও আমরা কোনো সহযোগিতাও পাই না। এই ঘরে গরমের সময় প্রচণ্ড গরম করে আর বৃষ্টির সময় ছোট বাচ্চারা খুব ভয় পায়।

স্থানীয় বাবুল ইসলাম বলেন, এরা খুব গরিব মানুষ। অনেকদিন ধরে এই এলাকায় আছে। আগে জুটমিলে কাজ করে খাইতো। হঠাৎ করে এই মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। পাগল হয়ে যাওয়ার পর ভাড়াও কেউ রাখে না। পরে আমরা এলাকাবাসী হাট বাজারে টাকা তুলে প্লাস্টিক দিয়ে এই ঘরটি করে দিয়েছি। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন এদের জন্য যে কোনো জায়গায় হোক ছোটখাটো একটা ঘর যেন করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় আসাদুল্লাহ দুলু বলেন, ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও তাদেরকে এই ঘরের মধ্যে থাকতে হয়। তাদের কোনো টিউবওয়েল নেই। তারা বাড়ির পাশের স-মিলের টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে।

ইউপি সদস্য উসমান গণি বলেন, তারা এখনও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো কিছু পাচ্ছেনা। সরকার থেকে যা আসে সেটা আমরা ধাপে ধাপে সবার মাঝে বিতরণ করছি।

ময়দানদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার বলেন, তাদের বিষয়ে আমার জানা নেই। মেম্বার বলতে পারবে। তারা যদি এই ইউনিয়নের বাসিন্দা হয়ে থাকে তাহলে তো সহযোগিতা পাবে। এখনতো কোনো কিছু দিতে হলে জাতীয় পরিচয় পত্র লাগে। জানি না তাদের আছে কীনা?

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার তৌকির আহমেদ বলেন, ওই নারী যদি বিধবা হয় এবং তার মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী হয় সেক্ষেত্রে আবেদন করেলে আমরা ভাতার ব্যবস্থা করে দেব।

এ বিষয়ে বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার নজির বলেন, ময়দানদিঘী ইউনিয়নের অসহায় বিধবা নারী তফুরা বেগমের ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। ময়দানদিঘীতে সরকারি কোনো খাস জমি নেই। থাকলে সেখানে তাকে কিছু করে দেওয়া যেত। আশ্রয়নের যে ঘরগুলো ময়দানদিঘীতে আছে সেগুলোও ফাঁকা নেই। ময়দানদিঘী ইউনিয়নের পাশের কোনো ইউনিয়নে ফাঁকা ঘর থাকলে সেখানে তাদের যাওয়ার সুযোগ আছে। আর যদি তিনি সেখানেই থাকতে চান সেক্ষেত্রে কোনো বৃত্তবান ব্যক্তি যদি তাকে জায়গা দেন তাহলে আমরা টিন দিয়ে ঘর করে দিতে পারি।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কীভাবে বাংলাদেশের জুলাইয়ের হতাহতের তালিকা প্রমাণ নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছিল

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে অভিযোগকারীকে আসামি এবং ভিকটিমকে বিবাদী করার অভিযোগ

জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

হাঁড়ি জ্বলছে না বাসায়, ঢাকা জুড়ে চরম গ্যাস সংকট

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম-ফেনী / হবিগঞ্জে বাধার পর সিলেটেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলা

আবু সাঈদ হত্যা / এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

‘ভারতীয় এজেন্ট’ আতঙ্ক ও শহীদ গেজেট বিতর্ক

কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ: এক অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র

গ্রিন ইয়ার্ডের আড়ালে রক্তের দাগ / জাহাজভাঙায় শতকোটির বিনিয়োগেও থামছে না মৃত্যু

অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় শেষ হলো ‘বর্ষামঙ্গল উৎসব ১৪৩৩’

১০

তীব্র গ্যাসসংকটে ধুঁকছে শিল্পখাত, উৎপাদনে স্থবিরতায় চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

১১

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণকবরের দাবি একটি ‘কল্পকাহিনী’

১২

‘টেসলা’ সমাচার: বৃষ্টি এলেই ভাড়া দ্বিগুণ, রাস্তায় নামলেই ঝুঁকি

১৩

‘জুলাই শহীদ’ গেজেটের অর্ধেক মৃত্যুই ৫ আগস্ট-এর পর

১৪

কীভাবে বাখের আলী বাংলাদেশের ‘গেজেটভুক্ত’ জুলাই শহীদ তালিকায় ‘কবির’ হয়ে গেলেন

১৫

আঁধারেই ডুবে আছে রাজধানী / বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

১৬

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

১৭

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর / শোক, স্মৃতি আর বিচার পাওয়ার আকুতিতে কাটল বিষাদময় দিন

১৮

স্পেনের বিশ্বজয়, মেসির বিষাদ / ১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরা লা রোখারা

১৯

স্থানীয় সরকার নির্বাচন / পরিস্থিতি খারাপ হলে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী, বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ ইসির

২০