ঢাকা বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৪ অক্টোবর ১৯৭১: বিনা শর্তে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি মধ্যপ্রদেশের বিধানসভায়

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৫৬ পিএম
পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের পর সপরিবার হুমায়ন রশিদ চৌধুরী। ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকার (ভারত) সৌজন্যে

যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির নিন্দা

যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি পাকিস্তানের নিন্দা করে দলের জাতীয় সম্মেলনে গ্রহণের জন্য ৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণের দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগের কারণে পাকিস্তান নিন্দনীয়। কারণ, তারা পূর্ব বাংলার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে দুইভাবে। প্রথমত, পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের সেনাদের অত্যাচার বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাংলাদেশের সব জনপ্রিয় নেতাকে মুক্তি দেওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা। কারণ, শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ করেছিল। জনগণের ইচ্ছানুযায়ী তাদের গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানের ব্যবস্থা করার জন্য জাতিসংঘকে প্রত্যক্ষ উদ্যোগ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনার কারণে এশিয়ায় বিঘ্নিত শান্তি ফিরিয়ে আনতে তিনটি উদ্যোগের কথা বলেন। ১. উপমহাদেশে সংযম রক্ষা করা; ২. দুর্ভিক্ষ নিবারণ ও শরণার্থীদের দেশে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সাহায্য কর্মসূচি প্রসার করা; ৩. কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করা। উপমহাদেশে শান্তি রক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তান ও ভারতকে তিনি সমভাবে দায়ী করেন।

জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের আনুগত্য প্রকাশ

ভারতের রাজধানী দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বাঙালি হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ৪ অক্টোবর পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনি পাকিস্তান হাইকমিশনের পরামর্শদাতা পদে কর্মরত ছিলেন। এপ্রিল মাসে তাঁকে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে দিল্লির মিশনে পাঠানো হয়।

দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনের আরেকজন বাঙালি কর্মী এবং হাইকমিশনের একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সচিব ফরিদউদ্দীন আহমদ সপরিবারে হাইকমিশন ভবন ত্যাগ করে বাংলাদেশ মিশনে যোগ দেন। ফরিদউদ্দীন আহমদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাইকমিশনের দেয়াল টপকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ মিশনে যান। এ সময় পাকিস্তান হাইকমিশনের কয়েকজন তাঁর পেছনে ধাওয়া করে। ট্যাক্সিচালকের দক্ষতায় তাঁরা রক্ষা পান।

মুজিবনগরের সূত্র থেকে চীনের মনোভাব

মুজিবনগরের একটি সূত্র সাংবাদিকদের এ দিন জানায়, বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হলে চীন পাকিস্তানকে সেনাসাহায্য করবে না। তবে অস্ত্রসহায়তা দেবে। চীন পাকিস্তানকে এখনো অস্ত্রসহায়তা দিচ্ছে। চীনের সবশেষ মনোভাব জানার জন্য বাংলাদেশ সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে।

গেরিলা অভিযান

১ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা সকাল আনুমানিক ১০টায় ফেনীর অন্তর্গত পরশুরামের বিলোনিয়ার কাছাকাছি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী গুতুমা সীমান্তঘাঁটির কাছে পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ করলে দুজন সেনা হতাহত হয়।

২ নম্বর সেক্টরের মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। মুক্তিবাহিনীর হালিম বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা সাদাপুরে একটি গোপন উপক্যাম্পে থাকাকালীন খবর আসে, পাশের সমসাবাদ গ্রামে সেনা ও রাজাকার সমন্বয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল এসেছে। মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত ওই গ্রামে গিয়ে তাদের আক্রমণ করেন। তাঁদের আকস্মিক আক্রমণে কয়েকজন সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পরও তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। চিকিত্সার জন্য চিকিত্সকের কাছে পাঠানোর সময় পথেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য স্বাধীনতার পর সরকার তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে।

এই সেক্টরের আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় পাকিস্তানি বাহিনীর সীমান্তবর্তী অবস্থানে হামলা করলে কয়েকজন হতাহত হয়। তাদের একটি নৌযান ডুবে সমরাস্ত্রেরও ক্ষতি হয়।

মধ্যপ্রদেশের বিধানসভায় বাংলাদেশ

ভারতের মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় এক প্রস্তাবে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার নিন্দা এবং বিনা শর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি করা হয়। জনসংঘ ও সোশ্যালিস্ট পার্টির কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা হলে বিরোধী দলের সদস্যরা সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। তাদের দাবি ছিল মূল প্রস্তাবে ভারতের অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের কথাটি জুড়ে দেওয়া হোক।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য

ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম দিল্লিতে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধানের মধ্যে বাংলাদেশের নিঃশর্ত স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

সূত্র

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক ও দুই;

আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত ৫ ও ৬ অক্টোবর ১৯৭১।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১০

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১১

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১২

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৩

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৪

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৫

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৬

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৭

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১৮

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৯

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

২০