ঢাকা রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

হাসনাবাদ গণহত্যা (নবাবগঞ্জ, ঢাকা)

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:১২ পিএম
হাসনাবাদ গণহত্যা (নবাবগঞ্জ, ঢাকা)

১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নবাবগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদে সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে ১২ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। এই নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ঘটনার বিবরণ

ঘটনার দিন পাকিস্তানি সৈন্যরা পার্শ্ববর্তী দোহার থানা হেডকোয়ার্টার্স থেকে মার্চ করে এসে নবাবগঞ্জের হাসনাবাদে পৌঁছে। তারা পথে দোহার থানার পশ্চিম-উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম ও জনপদ অতিক্রম করে। এ সময় তারা ইছামতি নদীবিধৌত ফারি ইক্রাশী ও কাঁচারীঘাট বাজারে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সহায়তায় তারা ইক্রাশী ও কাঁচারীঘাটের হিন্দু ও খ্রিস্টান পল্লীতে হামলা করে। এরপর তারা উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে নবাবগঞ্জ থানার হাসনাবাদের হিন্দু পালপাড়া ও খ্রিস্টান পল্লীতে আক্রমণ চালায়।

পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের সহযোগীদের সহায়তায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে গানপাউডার ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগ করে এবং ব্যাপক লুটপাট চালায়। এ সময় তারা বেশ কয়েকজন নারী ও শিশুর ওপর নির্মম নির্যাতন করে। আক্রমণের এক পর্যায়ে তারা হাসনাবাদ গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ১২ জনকে কাঁচারীঘাটে নদীতীরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। এই নৃশংসতার পর পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা প্রাণভয়ে পালিয়ে যান।

শহীদদের পরিচয়

হাসনাবাদ গণহত্যায় শহীদ ১২ জনের মধ্যে ১১ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন:

  • ব্রজেন পাল (পিতা: বৃন্দাবন পাল, হাসনাবাদ)
  • গৌরাঙ্গ পাল (পিতা: কালিচরণ পাল, হাসনাবাদ)
  • ধীরেন পাল (পিতা: সাধু পাল, হাসনাবাদ)
  • শংকর পাল (পিতা: নরেশ পাল, হাসনাবাদ)
  • মাধব সূত্রধর (পিতা: যতীন্দ্র সূত্রধর, হাসনাবাদ)
  • দিলীপ সূত্রধর (পিতা: ত্রৈলক্ষ্য সূত্রধর, হাসনাবাদ)
  • মনোরঞ্জন পাল (হাসনাবাদ)
  • পুলহাত পাল (পিতা: সতীশ পাল, হাসনাবাদ)
  • সুদর্শন পাল (হাসনাবাদ)
  • গোবিন্দ সাহা (নতুন বান্দুরা)
  • অনীল গমেজ (পিতা: পিটার গমেজ, মোলাশীকান্দা)

এই গণহত্যার পর শহীদদের লাশ সমাহিত করার মতো কেউ আশেপাশে ছিল না। ফলে তাদের দেহগুলো নদীতে নিমজ্জিত থাকে এবং এক থেকে দুই দিন পর নদীর স্রোতে ভেসে যায়।

পরিণতি

হাসনাবাদ গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নৃশংসতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ঘটনা স্থানীয় জনগণের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।

সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ১০ম খণ্ড (মো. আনোয়ার হোসেন ও আব্দুল মালেক সিকদার)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত? / রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আর জিয়ার ছিয়াত্তরের ৭ মার্চ পালন—বিপরীত যাত্রা

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণের দর্শন

পর্দার আড়ালের ইতিহাস / কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

৭ মার্চ ১৯৭১: বাঙালির মহাকাব্য

৭ মার্চ থেকে শুরু হলো পাকিস্তানের পতন

৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

১০

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গার্মেন্টস কর্মীর স্বপ্ন ও আসন্ন বাজেট

১১

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের পোশাক খাত / অস্তিত্বের সংকটে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’

১২

বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘একাত্তরের ছায়া’ / তেলের বাজারে আগুন, সংকটে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন

১৩

লক্ষ্য পূরণে অনমনীয় ট্রাম্প / বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

১৪

জ্বালানি সংকটের শঙ্কা / যানবাহনে তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দিল বিপিসি

১৫

মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে পিছু হটতে বাধ্য করার দাবি ইরানের

১৬

ইরানের পাল্টা আঘাত / মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ছায়া, বিপাকে ট্রাম্প প্রশাসন

১৭

৬ মার্চ ১৯৭১, উত্তপ্ত বাংলা ও ইয়াহিয়ার শেষ চাল

১৮

৫ মার্চ ১৯৭১: ক্ষোভ ও প্রতিরোধে উত্তাল রক্তস্নাত জনপদ

১৯

পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন

২০