ঢাকা শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

বাজেমানকোন গণহত্যা | মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৪৫ পিএম
বাজেমানকোন গণহত্যা | মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ

বাজেমানকোন গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মর্মান্তিক এবং নৃশংস ঘটনা। এই গণহত্যা সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার বাজেমানকোন গ্রামে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে এই গ্রামের অসংখ্য নিরীহ মানুষ নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। এই প্রতিবেদনে বাজেমানকোন গণহত্যার পটভূমি, ঘটনার বিবরণ, শিকারদের পরিচয়, ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং এই ঘটনার স্মৃতি রক্ষার প্রচেষ্টা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তথ্যের প্রাথমিক উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ (৬ষ্ঠ খণ্ড), সম্পাদক: শফিউদ্দিন তালুকদার।

বাজেমানকোন গ্রামের পটভূমি

বাজেমানকোন গ্রাম ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলায় অবস্থিত। এই গ্রামে হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করতেন, যারা প্রধানত কৃষিকাজ এবং অন্যান্য সাধারণ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাগাছা অঞ্চল পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নৃশংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বাজেমানকোন গ্রামের সামাজিক এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্য এই গণহত্যার পটভূমি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গণহত্যার ঘটনা

১৯৭১ সালের ২রা আগস্ট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাজেমানকোন গ্রামে প্রবেশ করে এবং নির্বিচারে গ্রামবাসীদের উপর হামলা চালায়। এই হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি সেনারা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের অসংখ্য নারী-পুরুষকে গুলি করে এবং অন্যান্য নৃশংস উপায়ে হত্যা করে। এই গণহত্যা পাকিস্তানি বাহিনীর দমননীতির অংশ ছিল, যার লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি স্থানীয় জনগণের সমর্থন দমন করা এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পুরুষ, নারী এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ ছিলেন, যা এই হত্যাকাণ্ডের নির্বিচার প্রকৃতি প্রকাশ করে।

বাজেমানকোন গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখযোগ্য-

  • জিতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর (পিতা: গিরিজা প্রসাদ ঠাকুর)
  • দিলীপ কুমার ঠাকুর (পিতা: জিতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর)
  • নারায়ণ চন্দ্র দে ওরফে তারেন দে (পিতা: গোপাল চন্দ্র দে)
  • যতীন্দ্র মোহন রায় (পিতা: শশী মোহন রায়)
  • কিদ্দো (পিতা: শামসুল হক)
  • মালেকা খাতুন (স্বামী: শামসুল হক)
  • ফেরদৌসী খাতুন (পিতা: শামসুল হক)
  • জুলেখা খাতুন (পিতা: শামসুল হক)
  • খালেদা খাতুন (স্বামী: হাজের আলী মণ্ডল)
  • রহিমন নেছা (স্বামী: হাজের আলী মণ্ডল)
  • হামেদা বানু (পিতা: হাজের আলী মণ্ডল)
  • হাজি মহর আলী (পিতা: গহর আলী)
  • জয়গন নেছা (স্বামী: নজর আলী)
  • সবুরন বেগম (স্বামী: ছমেদ আলী)
  • দিনুরা বেগম (পিতা: ছদেম আলী)
  • জামফত বেগম (স্বামী: আজগর আলী)
  • সুরুজা খাতুন (পিতা: আজগর আলী)
  • জুলেখা খাতুন (পিতা: আজগর আলী)
  • জহুর আলী (পিতা: জমির মণ্ডল)
  • সখিনা খাতুন (স্বামী: মহর আলী)
  • নজরুল ইসলাম (পিতা: মহর আলী)
  • বিবি হাওয়া (পিতা: মহর আলী)
  • সখিনা খাতুন (স্বামী: ফজর আলী)
  • নসিরন বেগম (স্বামী: নজর আলী মণ্ডল)
  • ফণীন্দ্র চন্দ্র দে (পিতা: কৃষ্ণচরণ দে)
  • সুধীর চন্দ্র দে (পিতা: শশী মোহন দে)
  • সুরেন্দ্র চন্দ্র সরকার (পিতা: বীরেন্দ্রনাথ সরকার)

এই তালিকায় নিহতদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। শিকারদের মধ্যে কৃষক, গৃহিণী এবং সাধারণ গ্রামবাসী ছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকেই পরিবারের একাধিক সদস্য হারিয়েছিলেন। এই তালিকা গণহত্যার নির্বিচার এবং নৃশংস প্রকৃতি প্রকাশ করে।

গণহত্যার তাৎপর্য

বাজেমানকোন গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ঘটনা কেবল বাজেমানকোন গ্রামের জন্যই নয়, সমগ্র মুক্তাগাছা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী এই গণহত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের দমন করতে এবং স্থানীয় জনগণের মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল। তবে এই ঘটনা উল্টো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধকে আরও জোরদার করে এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের চেতনাকে উজ্জীবিত করে।

স্মৃতিস্তম্ভ এবং স্মরণ

বাজেমানকোন গণহত্যার শিকারদের স্মরণে গণহত্যার স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সংরক্ষণের একটি প্রতীক। এই স্মৃতিস্তম্ভ স্থানীয় জনগণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে এই ঘটনার ইতিহাস সম্পর্কে শিক্ষিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয়ভাবে এই স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগের কথা স্মরণ করা হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং লুণ্ঠনের মতো যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে। বাজেমানকোন গণহত্যা এই ধরনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি। এই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হলেও, বাজেমানকোনের ঘটনায় দেখা যায় যে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই হত্যার শিকার হয়েছেন। এটি পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞের প্রকৃতি প্রকাশ করে।

স্মৃতি রক্ষা ও শিক্ষা

বাজেমানকোন গণহত্যার শিকারদের স্মৃতি রক্ষার জন্য এই ঘটনার ইতিহাস সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ঘটনার ইতিহাস পড়ানোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করা যেতে পারে। এই ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাজেমানকোন গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার একটি বেদনাদায়ক স্মারক। এই ঘটনায় অসংখ্য নিরীহ গ্রামবাসীর মৃত্যু শুধুমাত্র একটি গ্রামের ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের জনগণের আত্মত্যাগের প্রতীক। স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তাদের স্মৃতি রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের পথে বাংলাদেশের মানুষকে কী মূল্য দিতে হয়েছিল।

সূত্র

  • বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, সম্পাদক: শফিউদ্দিন তালুকদার

  • মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্য

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৮ আগস্ট ১৯৭১: মোগরার বিল গণহত্যা (মোহনপুর, রাজশাহী)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: পাকুড়িয়া গণহত্যা (মান্দা, নওগাঁ)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: দিরাই ও শাল্লা এলাকা হানাদারমুক্ত হয়

২৭ আগস্ট ১৯৭১: দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: কচুয়া বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লাতিন আমেরিকায় পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রস্তাব

২৬ আগস্ট ১৯৭১: নারী নির্যাতনে ইয়াহিয়ার সৈন্যরা মধ্যযুগের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে

২৫ আগস্ট ১৯৭১: সিলেটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচার

২৫ আগস্ট ১৯৭১: মানসা গণহত্যা ও বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লন্ডনে প্রবাসী সরকারের কূটনীতিক মিশন উদ্বোধন

১০

২৫ আগস্ট ১৯৭১: কানলা গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১১

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পূর্বপাড়া ওয়ারলেস কেন্দ্র গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১২

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পশ্চিমগ্রাম গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৩

২৬ আগস্ট ১৯৭১: দাসপাড়া গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৪

২৬ আগস্ট ১৯৭১: কুণ্ডুবাড়ি হত্যাকাণ্ড

১৫

২৬ আগস্ট ১৯৭১: তীব্র আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী কানসাট ছেড়ে পালায়

১৬

২৫ আগস্ট ১৯৭১: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ঘটনাবহুল দিন

১৭

২৪ আগস্ট ১৯৭১: দেশজুড়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

১৮

২৩ আগস্ট ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর জগন্নাথদিঘি ঘাঁটিতে আক্রমণ মুক্তিবাহিনীর

১৯

২১ আগস্ট ১৯৭১: পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ ইরাকে নিযুক্ত বাঙালি রাষ্ট্রদূতের

২০