ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৭ আগস্ট ১৯৭১: দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা)

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৪৭ পিএম
২৭ আগস্ট ১৯৭১: দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা)

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার দেয়াড়া গ্রামে একটি মর্মান্তিক গণহত্যা সংঘটিত হয়। এই গণহত্যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তাদের সহযোগী রাজাকার এবং বিহারিরা মিলিতভাবে নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

প্রেক্ষাপট

দিঘলিয়া খুলনা জেলার একটি উপজেলা এবং ইউনিয়ন। এটি খুলনা শহরের দৌলতপুরের পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদের অপর পারে অবস্থিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত থেকে কিছু অবাঙালি বিহারি এই এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে, যার ফলে এলাকাটি বিহারি কলোনি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বিহারিদের একাংশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল। জুন মাসের পর দিঘলিয়ায় রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়, এবং তারা পাকিস্তানি সেনাদের সাথে মিলিত হয়ে দেয়াড়া গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত করে।

দেয়াড়া গ্রামের ডা. মতিয়ার রহমানের ছেলে শেখ আবদার হোসেন ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর নেতৃত্বে এলাকার বেশ কিছু যুবক সংগঠিত হয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এই যুবকরা মাঝে মাঝে দিঘলিয়ায় রাজাকারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতেন। শেখ আবদার হোসেন খবর সংগ্রহ এবং যুবকদের সংগঠিত করার জন্য গোপনে গ্রামে আসতেন।

গণহত্যার বিবরণ

১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট ভোরে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার এবং বিহারিদের একটি বড় দল দেয়াড়া গ্রামে হামলা চালায়। তারা দৌলতপুরের পিপলস জুট মিলের পার্শ্ববর্তী খেয়াঘাট পার হয়ে গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামে ঢোকার পর স্থানীয় বিহারিরাও তাদের সাথে যোগ দেয়। পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও বিহারি মিলে শতাধিক হামলাকারী মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে।

হামলাকারীরা প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদার হোসেনকে খুঁজতে শুরু করে। তারা আবদার হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করে তাঁর পিতা ডা. মতিয়ার রহমানকে ধরে। মতিয়ার রহমানকে তারা বলে, “চলেন।” মতিয়ার রহমান জিজ্ঞাসা করেন, “কোথায় যেতে হবে?” হামলাকারীরা উত্তর দেয়, “কলোনিতে যেতে হবে।” এরপর তারা মতিয়ার রহমানের চাচাতো ভাই শেখ রহমত আলী পিরু ও শেখ মোশারফ আলী, ভাগ্নে শেখ ইসমাইল হোসেন (ছোট খোকা), জামাই আবদুল জলিল এবং জলিলের সহোদর আবদুল বারিককে ধরে আনে। এই ছয়জনকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মতিয়ার রহমানের পুত্র শেখ আফজাল হোসেন বলেন, “একদল লোক আব্বাকে নিয়ে চলে যায়। আর একদল আমাদের বাড়িতে নির্বিচারে গুলি করতে শুরু করে। যে যেখানে পারছে ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে। আমি একটি ঝোঁপের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে ফেলি… রাজাকারের দল আমার বাবা-সহ ছয়জনকে ধরে নিয়ে যায়।” রাস্তায় নিয়ে গিয়ে হামলাকারীরা এই ছয়জনকে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো শুরু করে এবং পরে গুলি করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

এই সময়ে গ্রামের অন্যান্য অংশে নৃশংস গণহত্যা চলতে থাকে। গ্রামের আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সৈয়দ আবুল বাশার ভয়ে রাস্তার একপাশে আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। একজন আক্রান্ত যুবক ভয়ে দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, “বাশার ভাই, আমাকে বাঁচাও।” হামলাকারীরা ওই যুবককে মাটিতে ফেলে কুপিয়ে হত্যা করে। এরপর তারা সৈয়দ আবুল বাশারকেও ধরে ফেলে এবং তাঁকেও কোপাতে শুরু করে। এক.timely manner, যতক্ষণ না তিনি নিথর হয়ে পড়েন, হত্যাকারীরা তাঁকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। সৌভাগ্যবশত, আবুল বাশার বেঁচে যান এবং পরে তাঁর পুত্র সৈয়দ ওবায়দুল হক হিরুকে ইশারায় ডেকে নেন। ওবায়দুল হক হিরু বলেন, “আমার আব্বাকে দেখিয়ে বলে, ‘ওই ব্যাটা মুক্তি আছে।’ এরপর আব্বাকে ওই দা দিয়ে কোপ দেয়। আব্বা উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। ওরা ফিরে যাচ্ছিল। এ সময়ে কে যেন বলে ওঠে, ‘এই! বাশারের শরীর থেকে রক্ত বেরোয়নি।’ যে আগে আব্বাকে কুপিয়েছিল, সেই আবার ফিরে এসে এলোপাতাড়িভাবে কোপাতে থাকে। আব্বার সারা শরীর থেকে রক্ত বেরুতে থাকে। ওরা চলে যায়।”

গণহত্যার পরিসংখ্যান

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই গণহত্যায় ৬১ জন নিরীহ গ্রামবাসী নিহত হন। এঁদের মধ্যে ২২ জনকে গ্রামের তিনটি গণকবরে সমাহিত করা হয়, এবং অবশিষ্ট মরদেহ ভৈরব নদে ফেলে দেওয়া হয়। এই গণহত্যায় দিঘলিয়ার গোয়ালপাড়া গ্রামের রাজাকার শওকত হোসেন এবং ব্রহ্মগাতি গ্রামের আবু জাফর নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

নিহতদের অধিকাংশই দেয়াড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না। নিরাপত্তার কারণে খুলনা শহরের অনেক মানুষ রাতে দেয়াড়া ও আশপাশের গ্রামে এসে রাত্রিযাপন করতেন এবং ভোরে চলে যেতেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন খুলনার বাইরের মানুষ, যারা চাকরি, ব্যবসা বা শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করতেন। ফলে, নিহতদের মধ্যে মাত্র ১৫ জনের নাম-পরিচয় জানা গেছে।

তাৎপর্য

দেয়াড়া গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নৃশংসতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ঘটনা শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে নয়, বরং নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপরও প্রতিশোধমূলক হামলার প্রমাণ বহন করে। এই গণহত্যা দেয়াড়া গ্রামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভয় এবং ক্ষতের সৃষ্টি করে।

সূত্র:

  • একাত্তরে খুলনা: মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস, দিব্যদ্যুতি সরকার

  • শেখ আফজাল হোসেনের সাক্ষাৎকার, গৌরাঙ্গ নন্দী, দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা: ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, ২০১৫), পৃ. ২৯

  • সৈয়দ ওবায়দুল হক হিরুর সাক্ষাৎকার, গৌরাঙ্গ নন্দী, দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা: ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, ২০১৫), পৃ. ২৭

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, অবসান ঘটছে দীর্ঘ ২৩ বছরের অধ্যায়ের

এমবাপ্পেদের ‘শ্বাস রোধ’ করে ফাইনালে স্পেন

হামের উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭৫৯

মা-বাবার হাতে কিশোরী খুন, বস্তাবন্দী করে মোটরসাইকেলে লাশ সড়কে ফেলেন বাবা

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর দাবি / আইনি লড়াই করতেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা

চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি, ঢল ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩০

মার্শাল আর্টের আড়ালে বোমার চর্চা: ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাবির

বগুড়ায় মিল মালিকের হাত-পা বেঁধে নৃসংশ হত্যাকাণ্ড, ট্রান্সফরমারের মালামাল লুট

সুপার টাইফুন ‘বাভি’র তাণ্ডব: লণ্ডভণ্ড মার্কিন দ্বীপপুঞ্জ রোটা ও গুয়াম

৮ কোটি টাকা বিতরণে পরামর্শক ও আমলাদের খরচ ৫৩ কোটি

১০

পরকীয়ার অভিযোগে তরুণ ও গৃহবধূকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, জোরপূর্বক বিয়ে

১১

খাগড়াছড়িতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে শাহিনের মৃত্যুদণ্ড

১২

জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

১৩

খাগড়াছড়িতে দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের জেরে গোলাগুলি, নিহত ৩

১৪

৬ জুলাই ১৯৭১: মুক্তাঞ্চলে জনপ্রতিনিধিদের শপথ, পাকিস্তানের মিথ্যাচার ও কিসিঞ্জারের অবরুদ্ধ যাত্রা

১৫

নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ‘শিখা অনির্বাণ’

১৬

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: ট্র্যাজেডি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান নিরাপত্তা সমীক্ষা

১৭

জাপানের জমাট রক্ষণ চূর্ণ করে ব্রাজিলের উল্লাস

১৮

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

১৯

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

২০