দিঘলিয়া খুলনা জেলার একটি উপজেলা এবং ইউনিয়ন। এটি খুলনা শহরের দৌলতপুরের পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদের অপর পারে অবস্থিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত থেকে কিছু অবাঙালি বিহারি এই এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে, যার ফলে এলাকাটি বিহারি কলোনি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বিহারিদের একাংশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল। জুন মাসের পর দিঘলিয়ায় রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়, এবং তারা পাকিস্তানি সেনাদের সাথে মিলিত হয়ে দেয়াড়া গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত করে।
দেয়াড়া গ্রামের ডা. মতিয়ার রহমানের ছেলে শেখ আবদার হোসেন ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর নেতৃত্বে এলাকার বেশ কিছু যুবক সংগঠিত হয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এই যুবকরা মাঝে মাঝে দিঘলিয়ায় রাজাকারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতেন। শেখ আবদার হোসেন খবর সংগ্রহ এবং যুবকদের সংগঠিত করার জন্য গোপনে গ্রামে আসতেন।
১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট ভোরে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার এবং বিহারিদের একটি বড় দল দেয়াড়া গ্রামে হামলা চালায়। তারা দৌলতপুরের পিপলস জুট মিলের পার্শ্ববর্তী খেয়াঘাট পার হয়ে গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামে ঢোকার পর স্থানীয় বিহারিরাও তাদের সাথে যোগ দেয়। পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও বিহারি মিলে শতাধিক হামলাকারী মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে।
হামলাকারীরা প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদার হোসেনকে খুঁজতে শুরু করে। তারা আবদার হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করে তাঁর পিতা ডা. মতিয়ার রহমানকে ধরে। মতিয়ার রহমানকে তারা বলে, “চলেন।” মতিয়ার রহমান জিজ্ঞাসা করেন, “কোথায় যেতে হবে?” হামলাকারীরা উত্তর দেয়, “কলোনিতে যেতে হবে।” এরপর তারা মতিয়ার রহমানের চাচাতো ভাই শেখ রহমত আলী পিরু ও শেখ মোশারফ আলী, ভাগ্নে শেখ ইসমাইল হোসেন (ছোট খোকা), জামাই আবদুল জলিল এবং জলিলের সহোদর আবদুল বারিককে ধরে আনে। এই ছয়জনকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মতিয়ার রহমানের পুত্র শেখ আফজাল হোসেন বলেন, “একদল লোক আব্বাকে নিয়ে চলে যায়। আর একদল আমাদের বাড়িতে নির্বিচারে গুলি করতে শুরু করে। যে যেখানে পারছে ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে। আমি একটি ঝোঁপের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে ফেলি… রাজাকারের দল আমার বাবা-সহ ছয়জনকে ধরে নিয়ে যায়।” রাস্তায় নিয়ে গিয়ে হামলাকারীরা এই ছয়জনকে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো শুরু করে এবং পরে গুলি করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে।
এই সময়ে গ্রামের অন্যান্য অংশে নৃশংস গণহত্যা চলতে থাকে। গ্রামের আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সৈয়দ আবুল বাশার ভয়ে রাস্তার একপাশে আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। একজন আক্রান্ত যুবক ভয়ে দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, “বাশার ভাই, আমাকে বাঁচাও।” হামলাকারীরা ওই যুবককে মাটিতে ফেলে কুপিয়ে হত্যা করে। এরপর তারা সৈয়দ আবুল বাশারকেও ধরে ফেলে এবং তাঁকেও কোপাতে শুরু করে। এক.timely manner, যতক্ষণ না তিনি নিথর হয়ে পড়েন, হত্যাকারীরা তাঁকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। সৌভাগ্যবশত, আবুল বাশার বেঁচে যান এবং পরে তাঁর পুত্র সৈয়দ ওবায়দুল হক হিরুকে ইশারায় ডেকে নেন। ওবায়দুল হক হিরু বলেন, “আমার আব্বাকে দেখিয়ে বলে, ‘ওই ব্যাটা মুক্তি আছে।’ এরপর আব্বাকে ওই দা দিয়ে কোপ দেয়। আব্বা উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। ওরা ফিরে যাচ্ছিল। এ সময়ে কে যেন বলে ওঠে, ‘এই! বাশারের শরীর থেকে রক্ত বেরোয়নি।’ যে আগে আব্বাকে কুপিয়েছিল, সেই আবার ফিরে এসে এলোপাতাড়িভাবে কোপাতে থাকে। আব্বার সারা শরীর থেকে রক্ত বেরুতে থাকে। ওরা চলে যায়।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই গণহত্যায় ৬১ জন নিরীহ গ্রামবাসী নিহত হন। এঁদের মধ্যে ২২ জনকে গ্রামের তিনটি গণকবরে সমাহিত করা হয়, এবং অবশিষ্ট মরদেহ ভৈরব নদে ফেলে দেওয়া হয়। এই গণহত্যায় দিঘলিয়ার গোয়ালপাড়া গ্রামের রাজাকার শওকত হোসেন এবং ব্রহ্মগাতি গ্রামের আবু জাফর নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
নিহতদের অধিকাংশই দেয়াড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না। নিরাপত্তার কারণে খুলনা শহরের অনেক মানুষ রাতে দেয়াড়া ও আশপাশের গ্রামে এসে রাত্রিযাপন করতেন এবং ভোরে চলে যেতেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন খুলনার বাইরের মানুষ, যারা চাকরি, ব্যবসা বা শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করতেন। ফলে, নিহতদের মধ্যে মাত্র ১৫ জনের নাম-পরিচয় জানা গেছে।
দেয়াড়া গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নৃশংসতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ঘটনা শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে নয়, বরং নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপরও প্রতিশোধমূলক হামলার প্রমাণ বহন করে। এই গণহত্যা দেয়াড়া গ্রামের মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভয় এবং ক্ষতের সৃষ্টি করে।
সূত্র:
একাত্তরে খুলনা: মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস, দিব্যদ্যুতি সরকার
শেখ আফজাল হোসেনের সাক্ষাৎকার, গৌরাঙ্গ নন্দী, দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা: ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, ২০১৫), পৃ. ২৯
সৈয়দ ওবায়দুল হক হিরুর সাক্ষাৎকার, গৌরাঙ্গ নন্দী, দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা: ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, ২০১৫), পৃ. ২৭
মন্তব্য করুন