ঢাকা শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৬ আগস্ট ১৯৭১: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাবলি ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৫৫ পিএম
৬ আগস্ট ১৯৭১: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাবলি ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন

৬ আগস্ট ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক কার্যক্রমের একটি সমন্বয় ঘটেছিল। এই প্রতিবেদনটি সেই দিনের বিভিন্ন ঘটনাকে একত্রিত করে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকে প্রভাবিত করেছিল।

বাংলাদেশ: প্রতিরোধ এবং নিপীড়ন

সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

৬ আগস্ট ১৯৭১-এ, কলকাতায় প্রকাশিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকায় ‘নিলামের সম্পত্তি কিনছে কারা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে পাকিস্তানের জঙ্গি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানানো হয়, যারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মান্নান এবং ‘দি পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক আবিদুর রহমানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানি সরকার এই নেতাদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিশোধমূলকভাবে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। প্রতিবেদনে পাকিস্তানের গভর্নর টিক্কা খানের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়, “এই সম্পত্তি কে কিনছে এবং কার এমন সাহস?” এটি আরও উল্লেখ করে যে, ২৫ মার্চের পর চার মাসে পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে কে সাহস করবে এই সম্পত্তি কিনতে?

ঢাকায় রাজনৈতিক ঘটনা

ঢাকায় এই দিনে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) পশ্চিম পাকিস্তান শাখার প্রধান নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান কাইয়ুম মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক খান এ সবুরের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে নসরুল্লাহ খান সাংবাদিকদের বলেন, “ভারতের মিথ্যাচার ও ঘৃণ্য অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও রাজনীতিবিদেরা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। দেশপ্রেমিক মুজাহিদ বাহিনী ও রাজাকাররা সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছে, যা প্রশংসনীয়।” এই বক্তব্য পাকিস্তানি প্রচারণার অংশ ছিল, যা দাবি করেছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একই দিনে, সিলেটের শান্তি কমিটির নেতা মকবুর আলী চৌধুরী, শাহাবুদ্দিনসহ পাঁচ সদস্যের একটি দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান নূরুল আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তারা দলের বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন, যা পাকিস্তানি শাসনের সমর্থনে শান্তি কমিটির ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।

দেশব্যাপী পাকিস্তানি সমর্থকদের তৎপরতা

পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আজম এই দিনে কুষ্টিয়ায় পুনর্গঠিত শান্তি কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এক সভায় তিনি বলেন, “জামায়াত কর্মীদের রাজাকার, শান্তি কমিটি ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে। ভারতের চর মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।” এই বক্তব্য পাকিস্তানি শাসনের সমর্থনে স্থানীয় সহযোগীদের উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা প্রকাশ করে।

একইভাবে, শায়খে জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ শাখার প্রাক্তন সদস্য সচিব মওলানা আতাহার আলী বলেন, “অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষায় রাজাকার ও মুজাহিদ কমিটিতে যোগ দেওয়ার বিকল্প নেই। পাকিস্তানকে প্রাণের বিনিময়ে হলেও রক্ষা করব। দেশদ্রোহী আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীর ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করে দেব।” এই বক্তব্যগুলো পাকিস্তানি শাসনের প্রতি আনুগত্য এবং মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধের মনোভাব প্রকাশ করে।

মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ

দেশব্যাপী মুক্তিবাহিনী এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসী অভিযান পরিচালনা করে। নরসিংদীর রায়পুরে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি রেঞ্জার ও রাজাকারদের এল এম হাইস্কুল ক্যাম্পে আক্রমণ করে। এই অভিযানে নয়জন পাকিস্তানি রেঞ্জার হতাহত হয়, যদিও একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থানায় মুক্তিবাহিনীর দুটি দল, ছাত্রনেতা হাশেম মামুদ ও সুবেদার মেজর জিয়াউল হকের নেতৃত্বে, বান্দরকাটা সীমান্ত ঘাঁটিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ৩০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়। তবে এই অভিযানে মুক্তিবাহিনীর পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং নয়জন আহত হন। এই অভিযানগুলো মুক্তিবাহিনীর ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর উপর চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা প্রদর্শন করে।

ভারত: বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আন্দোলন

বুদ্ধিজীবীদের গণবিবৃতি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্র শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, সাহিত্যিক এবং বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ৬ আগস্ট কলকাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে একটি গণবিবৃতি প্রকাশ করেন। এই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন সত্যজিৎ রায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, মনোজ বসু, সমরেশ বসু, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুবোধ ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, আবু সয়ীদ আইয়ুব, গৌরী আইয়ুব, শান্তিদেব ঘোষ, সন্তোষকুমার ঘোষ, কানন দেবী, মহাশ্বেতা দেবী, পূর্ণেন্দু পত্রী, বিমল কর, শঙ্খ ঘোষ, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন প্রমুখ।

বিবৃতিতে তারা বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষের মুক্তি চেয়েছেন বলে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি। অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তায় পাকিস্তান সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে কারাগারে আটকে রেখেছে। আমরা অতিসত্বর পাকিস্তান সরকারের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানাই।” এই বিবৃতি ৬ আগস্ট ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ এবং ৭ আগস্ট ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতের বুদ্ধিজীবী সমাজের সমর্থনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ভারতের লোকসভার উদ্যোগ

ভারতের লোকসভায় এই দিনে ৫৪৫ সদস্যের মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন সদস্য জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠান। এতে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে আটকের প্রতিবাদ জানিয়ে তাকে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয় এবং পাকিস্তানের উপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া, পূর্ব বাংলায় চলমান অস্থিরতা নিরসনে পাকিস্তানকে কঠোর বার্তা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি অনুরোধ করা হয়।

একই দিনে, দিল্লিতে নব কংগ্রেসের একদল কর্মী পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং হাইকমিশনের গেটে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে একটি স্মারকলিপি সাঁটে।

কূটনৈতিক পদক্ষেপ

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দিনে মিত্র মুসলিম দেশগুলোর কাছে একটি চিঠি পাঠায়, যাতে অনুরোধ করা হয় যে, আসন্ন সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের কাবুলে অনুষ্ঠিতব্য ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে পাকিস্তানকে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালানোর কোনো সুযোগ না দেওয়া হয়। মিসর সরকারের মাধ্যমে এই অনুরোধ মিত্র দেশগুলোর কাছে পৌঁছানো হয়। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতের কূটনৈতিক সমর্থনের অংশ ছিল।

গ্রোমিকোর দিল্লি সফর

৬ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বার্তা সংস্থা ‘তাস’ আকস্মিকভাবে ঘোষণা করে যে, সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো ভারতের রাজধানী দিল্লি সফরে আসছেন। দিল্লি থেকেও এই ঘোষণার সত্যতা নিশ্চিত করে বলা হয়, তিনি ৮ আগস্ট বিকেলে দিল্লি পৌঁছাবেন। এই ঘোষণা বিশ্ব কূটনৈতিক মহলে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে হতবাক সৃষ্টি করে। এর কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন পিকিং সফর বিশ্ব কূটনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পাকিস্তানের ভারতবিরোধী যুদ্ধের হুমকির প্রেক্ষাপটে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মস্কোতে নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ডি পি ধরকে জরুরি দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। গ্রোমিকোর সফর ছিল এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। এটি ছিল প্রথম কোনো সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের পাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

পাকিস্তান: প্রচারণা ও নীতি

চীনের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি

ইসলামাবাদে ৬ আগস্ট একজন সরকারি মুখপাত্র জানান, চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে একটি চিঠিতে বলেছেন, “যদি ভারত অযাচিতভাবে পাকিস্তানের ওপর হামলা চালায়, তবে চীন পাকিস্তানকে সব ধরণের সহায়তা ও সমর্থন দেবে।” এই বক্তব্য পাকিস্তানের জন্য চীনের কূটনৈতিক সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়, যা ভারতের সঙ্গে উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।

আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা

পাকিস্তান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এই দিনে একটি প্রেসনোট জারি করে জানায়, ২৮ জুনের বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে, আওয়ামী লীগের এমএনএ ও এমপিদের মধ্যে যারা পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছে, তাদের মধ্যে ৮৮ জন তাদের পদে বহাল থাকবেন। এই প্রেসনোটে তাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, যারা “নাশকতামূলক কার্যকলাপে” জড়িত ছিল, তাদের চিরস্থায়ীভাবে এমএনএ ও এমপি পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতৃত্বকে দমন করার প্রচেষ্টার অংশ ছিল।

আন্তর্জাতিক মহল: বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন

মার্কিন সিনেটরের বক্তব্য

মার্কিন সিনেটের উদ্বাস্তু বিষয়ক বিচার বিভাগীয় উপপরিষদের চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ৬ আগস্ট মার্কিন সিনেটে বলেন, “পাকিস্তানকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার কারণেই উদ্বাস্তু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।” তিনি নিক্সন প্রশাসনকে শরণার্থী সমস্যার প্রতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বাস্তবতাবর্জিত নীতি গ্রহণের জন্য অভিযুক্ত করেন। এই বক্তব্য পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন নীতির সমালোচনা এবং বাংলাদেশের শরণার্থী সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের দূতের তৎপরতা

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত আবু সাঈদ চৌধুরী এবং অধ্যাপক ড্রেপার ৬ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে লন্ডনে ফিরে আসেন। তারা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য জঁ জিগলার এবং রেডক্রস ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

পাকিস্তানের প্রচারণার বিরুদ্ধে সমালোচনা

লন্ডনে পিডিপির সহ-সভাপতি মাহমুদ আলী একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “পশ্চিমা গণমাধ্যম পাকিস্তানের নামে মিথ্যাচার ও গুজব ছড়াচ্ছে। তারা পাকিস্তানকে নরকের সঙ্গে তুলনা করে পাকিস্তানের শান্তিপ্রিয় মানুষকে অপমান করেছে।” তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, এবং দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। মাহমুদ আলী এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পশ্চিম জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম সফরের পরিকল্পনা করেন, যাতে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালানো যায়।

নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়

মার্কিন গণমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এই দিনে একটি সম্পাদকীয়তে বলে, “ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাস এবং জাতিসংঘের পাকিস্তান মিশন থেকে বাঙালি কর্মকর্তাদের পদত্যাগ প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’র দাবি মিথ্যা।” এই সম্পাদকীয় পাকিস্তানের প্রচারণার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সমালোচনামূলক অবস্থান তুলে ধরে।

৬ আগস্ট ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বহুমুখী দিন ছিল। মুক্তিবাহিনীর সাহসী প্রতিরোধ, ভারতের বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য আন্দোলন, সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের ঘোষণা, এবং পাকিস্তানের প্রচারণা ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ এই দিনের ঘটনাগুলোকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল। এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য দেশি-বিদেশি সমর্থন এবং পাকিস্তানের দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিত্র তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

সাপ্তাহিক জয় বাংলা পত্রিকা, ৬ আগস্ট ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৬ আগস্ট ১৯৭১

দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬, ৭ ও ৮ আগস্ট ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান, ৭ ও ৮ আগস্ট ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, দুই ও এগারো

মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি: যুক্তরাজ্য, আবদুল মতিন, সাহিত্য প্রকাশ

দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ ও ৮ আগস্ট ১৯৭১

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৮ আগস্ট ১৯৭১: মোগরার বিল গণহত্যা (মোহনপুর, রাজশাহী)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: পাকুড়িয়া গণহত্যা (মান্দা, নওগাঁ)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: দিরাই ও শাল্লা এলাকা হানাদারমুক্ত হয়

২৭ আগস্ট ১৯৭১: দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: কচুয়া বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লাতিন আমেরিকায় পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রস্তাব

২৬ আগস্ট ১৯৭১: নারী নির্যাতনে ইয়াহিয়ার সৈন্যরা মধ্যযুগের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে

২৫ আগস্ট ১৯৭১: সিলেটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচার

২৫ আগস্ট ১৯৭১: মানসা গণহত্যা ও বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লন্ডনে প্রবাসী সরকারের কূটনীতিক মিশন উদ্বোধন

১০

২৫ আগস্ট ১৯৭১: কানলা গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১১

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পূর্বপাড়া ওয়ারলেস কেন্দ্র গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১২

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পশ্চিমগ্রাম গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৩

২৬ আগস্ট ১৯৭১: দাসপাড়া গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৪

২৬ আগস্ট ১৯৭১: কুণ্ডুবাড়ি হত্যাকাণ্ড

১৫

২৬ আগস্ট ১৯৭১: তীব্র আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী কানসাট ছেড়ে পালায়

১৬

২৫ আগস্ট ১৯৭১: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ঘটনাবহুল দিন

১৭

২৪ আগস্ট ১৯৭১: দেশজুড়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

১৮

২৩ আগস্ট ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর জগন্নাথদিঘি ঘাঁটিতে আক্রমণ মুক্তিবাহিনীর

১৯

২১ আগস্ট ১৯৭১: পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ ইরাকে নিযুক্ত বাঙালি রাষ্ট্রদূতের

২০