ঢাকা রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

রং হারিয়ে ঝুঁকিতে বিশ্বের অধিকাংশ প্রবালপ্রাচীর

প্রিয়ভূমি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:২৪ পিএম
প্রবাল

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে ব্লিচিং বা রং হারানোর কবলে পড়েছে বিশ্বের প্রায় ৮৪ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর। এতে প্রবালগুলো মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার (২৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক প্রবাল প্রাচীর উদ্যোগ (আইসিআরআই) এ তথ্য জানিয়েছে। এটাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রবাল ব্লিচিংয়ের ঘটনা বলে অভিহিত করেছে সংস্থাটি।

২০২৩ সালের বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কোরাল ব্লিচিং বা সামুদ্রিক শৈবালের রং হারানোর এই সংকট শুরু হয়, যা চলতি বছর তীব্র আকার ধারণ করে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) খবরে এমন তথ্য জানানো হয়।

আইসিআরআইয়ের তথ্যমতে, এ নিয়ে চতুর্থ বারের মতো প্রবাল ব্লিচিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। আশির দশক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রবালপ্রাচীরের মধ্যে ঝুঁকির বিষয়টি লক্ষ করা যায়। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পর্যবেক্ষণের তথ্য থেকে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে সারা বিশ্বের সব প্রবালপ্রাচীর ব্লিচের শিকার হয়। এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল নাগাদ বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ প্রবালপ্রাচীর রং হারায়। ওই ঘটনার পর সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ আকারে আবারও শুরু হয়েছে প্রবাল ব্লিচিং।

আন্তর্জাতিক প্রবালপ্রাচীর সোসাইটির নির্বাহী সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের প্রধান পর্যবেক্ষক মার্ক একিন বলেন, তাপদাহের কারণে সামুদ্রিক প্রবালের রং হারানোর ঘটনায় বিশ্বব্যাপী এমন সংকট তৈরি হতে এর আগে কখনোই দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি যা পৃথিবীর চেহারাই বদলে দেবে। শুধু তাই নয়, এটি সামুদ্রিক জীব ও তাদের জীবিকার সক্ষমতাকেও বদলে দেবে।

২০২৪ সাল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছর। মেরু অঞ্চলে সমুদ্রের তলদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৮৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির এক-চতুর্থাংশের আবাসস্থল হচ্ছে প্রবালপ্রাচীর। এজন্য একে সমুদ্রের রেইন ফরেস্টও বলা হয়। এছাড়া সামুদ্রিক খাদ্য উৎপাদন, পর্যটন, উপকূলকে ক্ষয় ও ঝড় থেকে রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে প্রবালপ্রাচীর।

গবেষকদের তথ্যমতে, প্রবাল একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সীমার মধ্যে সক্রিয় থাকে। প্রবালের উজ্জল রংয়ের কারণ তার ভেতরে থাকা রঙিন শৈবাল। এটি প্রবালগুলোর খাবারেরও উৎস। তবে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে প্রবালের রং ও পুষ্টির উৎস ক্ষুদ্র সেই শৈবালগুলো ভেতর থেকে বের হয়ে যায়। আর তাই তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে প্রবালপ্রাচীর একপর্যায়ে সাদা হয়ে যায়। এতে প্রবালগুলো মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

অনেকদিন ধরে চলমান এই ব্লিচের কবলে পড়েছে অষ্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফটিও। বিগত নয় বছরের মধ্যে সেখানে সবচেয়ে বড় ব্লিচের ঘটনা ঘটেছে বলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইনস্টিটিউড অব মেরিন সায়েন্স ও গ্লোবাল কোরাল রিফ মনিটরিং নেটওয়ার্কের (জিসিআরএমএন) পর্যবেক্ষক ড. ব্রিটা শ্যাফেল বলেন, এর আগে কখনো এমন সংকটের মুখে পড়েনি প্রবালপ্রাচীর।

তিনি বলেন, যারা নিজেদের পুরো জীবন এসব প্রবালের দেখাশোনা ও সুরক্ষার জন্য ব্যয় করেছেন তাদের জন্য এটি খুবই হতাশাজনক। বাস্তুতান্ত্রিক ক্ষতির বিষয়ে এই কষ্ট বাস্তব। যারা পানির নিচে এসব শৈবালের পর্যবেক্ষণে থাকেন, তারা চোখের সামনেই এই পরিবর্তন হতে দেখছে।

এপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রবাল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। সিচেলিস উপকূলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা প্রবালের টুকরো নিয়ে সেগুলাকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (জু) বংশবিস্তার করানোর চেষ্টা করছে নেদারল্যান্ডসের একটি গবেষণাগার।

অন্যদিকে ফ্লোরিডার কাছে আরেকটি প্রকল্পে অতিরিক্ত তাপে বিপন্ন প্রবালগুলোকে উদ্ধার করে সেগুলোকে সুস্থ করে তোলার পর আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

মার্ক বলেন, প্রবাল প্রাচীর রক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলো মোকাবিলা করা। জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো বন্ধ করে ক্ষতিকর গ্যাসগুলোর নির্গমন বন্ধ না করা হলে অন্য কোনো সমাধানই স্থায়ী হবে না বলে মত দেন তিনি।

জিসিআরএমএনের ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের স্টিয়ারিং কমিটির গবেষক মেলাইন ম্যাকফিল্ড বলেন, মানুষকে বুঝতে হবে তারা আসলে কি করছেন। মানুষের কর্মকান্ডের ফলে রং হারিয়ে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়া প্রবালগুলো ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এমন এক সময় এই তথ্যগুলো সামনে এসেছে যখন দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার প্রত্যাহার করে জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটাতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গবেষক মার্ক বলেন, আমরা এমন এক সরকার পেয়েছি, যারা বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে চলেছে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত? / রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আর জিয়ার ছিয়াত্তরের ৭ মার্চ পালন—বিপরীত যাত্রা

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণের দর্শন

পর্দার আড়ালের ইতিহাস / কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

৭ মার্চ ১৯৭১: বাঙালির মহাকাব্য

৭ মার্চ থেকে শুরু হলো পাকিস্তানের পতন

৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

১০

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গার্মেন্টস কর্মীর স্বপ্ন ও আসন্ন বাজেট

১১

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের পোশাক খাত / অস্তিত্বের সংকটে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’

১২

বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘একাত্তরের ছায়া’ / তেলের বাজারে আগুন, সংকটে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন

১৩

লক্ষ্য পূরণে অনমনীয় ট্রাম্প / বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

১৪

জ্বালানি সংকটের শঙ্কা / যানবাহনে তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দিল বিপিসি

১৫

মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে পিছু হটতে বাধ্য করার দাবি ইরানের

১৬

ইরানের পাল্টা আঘাত / মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ছায়া, বিপাকে ট্রাম্প প্রশাসন

১৭

৬ মার্চ ১৯৭১, উত্তপ্ত বাংলা ও ইয়াহিয়ার শেষ চাল

১৮

৫ মার্চ ১৯৭১: ক্ষোভ ও প্রতিরোধে উত্তাল রক্তস্নাত জনপদ

১৯

পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন

২০