ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস

আজ ১৯ মার্চ, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন গাজীপুরের (তৎকালীন জয়দেবপুর) বীর জনতা। একাত্তরের উত্তাল মার্চের এই দিনটি বাঙালির সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে সারা দেশে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। জয়দেবপুরও ছিল এর ব্যতিক্রম নয়। ২ মার্চ রাতে তৎকালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তার বাসায় এক সর্বদলীয় সভায় আ.ক.ম. মোজাম্মেল হককে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের 'সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয় । ৩ মার্চ গাজীপুর স্টেডিয়ামের বটতলায় পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং স্বাধীনতার স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা ।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার পর জয়দেবপুরের হাজার হাজার মানুষ লাল ফিতা বেঁধে রেসকোর্স ময়দানে যোগ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ মার্চ জয়দেবপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করে জনতা এবং ১৩ মার্চ তৎকালীন জিওসি ইয়াকুব আলীর হেলিকপ্টার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ফেরত পাঠানো হয় ।

১৯ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধ

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে জয়দেবপুরের নেতৃবৃন্দ তাকে জানান যে, পাকিস্তানি বাহিনী কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুত কমের অজুহাতে ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্র কেড়ে নিতে চায়। বঙ্গবন্ধু সাফ জানিয়ে দেন, "বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেয়া যাবে না। Resist at the cost of anything." ।

আর মাত্র দুই দিন পরেই, ১৯ মার্চ শুক্রবার, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের নেতৃত্বে একটি দল জয়দেবপুরে ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করতে আসে । খবর পেয়ে শিমুলতলী, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার শ্রমিক-জনতা লাঠি, রামদা, বল্লম ও কিছু পুরোনো বন্দুক নিয়ে জড়ো হতে থাকেন । জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, গাছের গুঁড়ি ও ইট দিয়ে বিশাল বাধা (ব্যারিকেড) সৃষ্টি করা হয়।

প্রতিরোধকারী জনতা দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি রেশন কনভয় আটকে সেখান থেকে ৪টি চাইনিজ রাইফেল ও ১টি এসএমজি ছিনিয়ে নেয় । এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায়। এই গুলিবর্ষণে মনু খলিফা ও কিশোর নেয়ামত ঘটনাস্থলেই শহীদ হন । চান্দনা চৌরাস্তায়ও তুমুল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সেখানে স্থানীয় খ্যাতনামা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত উল্লাহ একজন পাকিস্তানি সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সেনাদের গুলিতে তিনি শহীদ হন ।

দিনজুড়ে ঘটনাপ্রবাহ

এই দিন সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সরকারি-আধাসরকারি ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে । জয়দেবপুরের এই সংঘর্ষের খবর বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ে এবং সন্ধ্যায় জয়দেবপুর শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করা হয় ।

এদিন জয়দেবপুরে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, “যারা বুলেট ও শক্তি দিয়ে গণআন্দোলনকে স্তব্ধ করবেন বলে ভেবেছেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন...এর অর্থ এই নয়, তারা শক্তি প্রয়োগে ভয় পায়।” । এদিন বিকেলে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে জনতার উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচার ব্যবস্থা করে যাব।” ।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরতির পর বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে তৃতীয় দফা একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় । সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন অংশ নেন । একই দিনে ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলনে ইয়াহিয়ার সমালোচনা করে বলেন, “ইয়াহিয়া খানের বোঝা উচিত, শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া পাকিস্তানকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।” ।

ফলাফল ও তাৎপর্য

জয়দেবপুরের এই প্রতিরোধ ব্যর্থ করে দেয় পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা। এই ঘটনার পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে নতুন প্রেরণা। দেশজুড়ে স্লোগান ওঠে 'জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর' ।

এই বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাজীপুরবাসীর উদ্দেশে পাঠানো এক পত্রে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং জয়দেবপুরবাসীকে অভিনন্দন জানান। সেদিনের শহীদদের স্মরণেই ১৯৭২-৭৩ সালে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় নির্মাণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’। ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের তৈরি এই ৪২ ফুট উঁচু ভাস্কর্যটিতে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ডান হাতে গ্রেনেড নিক্ষেপণ ও বাম হাতে রাইফেল ধরা অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে এবং এর গায়ে খোদাই করা আছে ২০৭ জন শহীদের নাম ।

১৯৭১ সালের এই দিনটি কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের সূচনা যা এক মুক্তিযুদ্ধে রূপ নিয়ে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১১ জুন ১৯৭১: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

৬ জুন ১৯৭১: অসাম্প্রদায়িকতার ডাক, রাজনৈতিক সমাধানের ৪ শর্ত

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক, কোন দেশে কত?

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

১০

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

১১

৪ জুন ১৯৭১: ছাতনীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক চাপ ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধ

১২

৩ জুন ১৯৭১: জাতিসংঘে তোলপাড়, বিশ্ব জনমত গঠন ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত

১৩

তোফায়েল আহমেদ / বর্ণাঢ্য রাজনীতির এক ফিনিক্স পাখি

১৪

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

১৫

১ জুন ১৯৭১: নগরকান্দা গণহত্যা, রণাঙ্গনে বিজয় ও বিশ্ব কূটনীতির নতুন মোড়

১৬

৩১ মে ১৯৭১: ‘সমঝোতার সুযোগ নেই’, বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও রণাঙ্গনের খণ্ডচিত্র

১৭

৩০ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, রণাঙ্গনের প্রতিরোধ ও বিশ্ব কূটনৈতিক অঙ্গন

১৮

রক্তস্নাত বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)

১৯

২৬ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, প্রতিরোধ ও বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গন

২০