
১) আপনারা এটাকে নতুন প্ল্যাটফর্ম বলছেন কেন? এরা তো অনেক আগে থেকেই বিরাজ করছে। কয়েকটা প্ল্যাটফর্মে বিভক্ত হয়ে ছিল বটে, কিন্তু এরা সবসময়ই ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। এদের মৌলিক আদর্শ হচ্ছে, যে কোনো অবস্থাতেই আওয়ামী লীগ বিরোধিতা, যে কোনো অবস্থাতেই ভারত বিরোধিতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধ করা। আর এদের কর্মকৌশল হচ্ছে যেখানেই জনসমাবেশ দেখবে সেখানেই গিয়ে যোগ দেওয়া, নানারকম বাগাড়ম্বর করা, সুনির্দিষ্ট রাজনীতি ছাড়া নানারকম এলেবেলে জার্গন ঝাড়া। আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে ওদের, আমেরিকা ও ভারতের নানা কর্মসূচি থেকে শ্লোগান ধার করা এবং সম্পূর্ণ বিপরীত ক্ষেত্রে সেইগুলো ব্যবহার করা।
এইটাই হচ্ছে ওদের মৌলিক কাঠামো। আর যে শ-দুয়েক লোক আছে এইরকম সারা দেশ জুড়ে, এরা প্রত্যেকেই মনে করে যে তিনি নিজেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান। মোটা না পড়ালেখা, কিন্তু জটিল বিশেষায়িত বিষয় নিয়ে বিজ্ঞের মতো মতামত দিতে থাকে। মতামতের ধরন কী বলব? ঐ যে, 'ত্র্যম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ, শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ। বিবর্তন আবর্তন সম্বর্তন আদি, জীবশক্তি শিবশক্তি করে বিসম্বদী। আকর্ষণ বিকর্ষণ পুরুষ প্রকৃতি, আণব চৌম্বকবলে আকৃতি বিকৃতি। কুশাগ্রে প্রবহমান জীবাত্মবিদ্যুৎ, ধারণা পরমা শক্তি সেথায় উদ্ভূত। ত্রয়ী শক্তি ত্রিস্বরূপে প্রপঞ্চে প্রকট—সংক্ষেপে বলিতে গেলে, হিং টিং ছট্।' লেন, এইবার আপনে হাততালি দেন।
(২) না, এমনিতে জোকারের মতো মনে হলেও এরা কিন্তু সিরিয়াস ধরনের ফ্যাসিস্ট। ওদের যে মৌলিক নীতিগুলো, আওয়ামী লীগ সংক্রান্ত সকল বিষয়ের বিরোধ করা, ভারত বিরোধিতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধ করা, এইগুলো নিয়ে আপনি কিছু বলবেন তো গেছেন। এরা প্রথমে আপনার দিকে এমন একটা দৃষ্টি মারবে, যেন আপনি নিতান্ত একটা গুবরে পোকা, আপনার সাথে সামাজিকতা করাই বৃথা। এরপর আপনাকে ফ্যাসিবাদের দোসর চিহ্নিত করে ওদের জামাতি কাকুদের কাছে গিয়ে বলবে, কাকু ওকে মারেন। ওদের নিজেদের সাহস নাই, শক্তি নাই, কিন্তু মনের খায়েশ আছে পুরা সিরাজ সিকদারের মতো, যাকে পছন্দ নয় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। পুরা ফ্যাসিস্ট।
এবং এরা সাধারণভাবে ভণ্ড। ভণ্ড কিরকম? এদের কোনো গণক্যারেক্টার নাই, জনগণের মধ্যে কোনো যোগাযোগও নাই। কিন্তু নামের সাথে দেখবেন প্রায়ই গণ, জন এইরকম সব শব্দ জুড়ে দেয়। মাঝে মাঝেই দেখবেন নিজের মনের খায়েশকে জনআকাঙ্ক্ষা আর নিজের হিংটিংছটকে জনভাষ্য নাম দিয়ে বিশাল লিফলেট ছাপিয়ে ছড়াতে থাকবে। এখন অবশ্য আর ঐ হারে লিফলেট ছাপায় না, ফেসবুকে পোস্ট দেয়। ওদের ভণ্ডামির আরেকটা দিক আছে। এরা অরুন্ধতী রায় আর মামদানি ধরনের ক্যারেক্টারের খুব ভক্ত। কেন? কারণ ওরা মুসলমানদের অধিকারের পক্ষে বলে। ওরা তো মুসলমানদের কথা বলে কারণ ভারতে ও আমেরিকায় মুসলিমরা সংখ্যালঘু। আপনি যদি ওদের সাথে নীতিগতভাবে ঐক্য অনুভব করেন তাহলে তো আপনি আপনাদের দেশের সংখ্যালঘুর পক্ষে কথা বলবেন। না, এরা বাংলাদেশেও মুসলমান মুসলমান করতে থাকে। ভণ্ডামি নয়?
(৩) আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন, ওদেরকে বিপক্ষে পাবেন। নারী অধিকারের পক্ষে কথা বলেন, ওদেরকে বিপক্ষে পাবেন। বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলেন, ওদেরকে বিপক্ষে পাবেন। পশ্চাৎপদ পিতৃতান্ত্রিক এবং রক্ষণশীল সব অবস্থানে ওদেরকে পাবেন, তবে সবকিছুই ওরা করবে আধুনিক না দিয়ে এবং সেইজন্যে ওরা হিংটিং ছট ধরনের ভাষ্য তৈরি করবে। সেই ভাষ্য আবার সুগঠিত ভাষায় ফেসবুক পোস্ট আকারে আপনাদের মাঝে ছড়িয়ে দিবে। সত্তরের মাওবাদীদের চেয়েও এরা খারাপ। ভণ্ডামির ধরন কিরকম জানেন? মৌলবাদীরা যখন মন্দির পুড়িয়ে দেয়, এরাও আপনার আমার পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের ভান করে, আর বাড়ি গিয়ে ফেসবুকে লেখে কাজটা খারাপ হয়েছে তবে এটা মুসলমানরা করেনি এটা ভারতের ষড়যন্ত্র।
থাক আর কিছু বললাম না। ওদের এই নয়া দোকান উন্মোচিত হোক, তখন ওদের ঘোষিত নীতি আদর্শ ও লক্ষ্য যেগুলো বলবে সেগুলোর মধ্যে আমার কথা মিলিয়ে নিবেন। আমি আপাতত ঐটুকুই বলে রাখলাম। তবে অনেকে যে বলেন ওরা নাকি পয়সা খেয়ে এইসব করে সেটা আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। এদের বিরুদ্ধে সম্ভবত মৌলানা ভাসানির মতো পয়সা খেয়ে আন্দোলন করার বা আইয়ুব খানের কাছ থেকে নয় লাখ টাকা নিয়ে আন্দোলনে পিছুটান দেওয়ার মতো অভিযোগ করা যায় না। আর যদি কেউ টাকা-পয়সা দেয়ও, সেগুলো খুব বেশি হবে না, বেশি টাকা ওদেরকে কে দিবে? সেই আওকাত আছে নাকি ওদের।
(৪) এনিওয়ে, করুন আপনারা নয়া পাটাতন। আপনাদেরকে মোবারকবাদ। অল্প কিছু লোক নানাভাগে বিভক্ত হয়ে নানাপ্রকার কুটকচাল করলে সেটা শুনতে ভারি শোনায়। পনেরো জন লোক তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে ফুক্কা কুল্লে হুক্কা হুয়া বলতে থাকে, দিয়েনর বেলায়ই সন্ধ্যার অনুভূতি হবে।
মন্তব্য করুন