ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

কালার রেভল্যুশন ও জনরোষ: ইতিহাসের এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ

কালার রেভল্যুশন ও জনরোষ: ইতিহাসের এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ

(১) চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ঘটনা যে আরেকটা কালার রেভল্যুশন ছিল, সেটা জানা তো খুব জটিল কোনো কাজ নয়। এটা নিয়ে অনেকেই বলেছেন; আমেরিকার সেই অর্থনীতিবিদ, প্রফেসর জেফরি স্যাকস তো সবিস্তারেই তাঁর মতামত জানিয়েছিলেন সেই চব্বিশ সনেই। নানা ফোরামে প্রফেসর স্যাকস সেটা নিয়ে বক্তৃতা করেছেন। কালার রেভল্যুশনের পেছনে বিদেশিদের হাত থাকে, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা থাকে, প্রশিক্ষণ থাকে; দক্ষ লোকজন দিয়েও ওরা সহায়তা করে। এগুলি দৃশ্যত সত্যি, ইউক্রেনের ঘটনা তো আমরা জানি, সেখানেও এইরকম একটা কালার রেভল্যুশন হয়েছিল—আমাদের ঘটনার সাথে অনেক মিল।

কেউ যখন অভিযোগ করে যে চব্বিশের ঘটনাটা পুরো একটা কালার রেভল্যুশন ছিল, আমি ওদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি। খোলা মনেই শুনি—ওদের ধারণা সত্যি হতেও পারে, নাও হতে পারে এইভাবে। কিন্তু যারা কালার রেভল্যুশনের অভিযোগ করেন, ওরা সাধারণত একটা কথা ভুলে যান। দেশে যদি মানুষের মধ্যে কিছু ন্যায্য ক্ষোভ না থাকে, তাহলে কিন্তু সে দেশে কোনো কালার রেভল্যুশন সম্ভব হয় না। যতগুলো দেশে কালার রেভল্যুশন হয়েছে, আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন—দেশের মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো কারণে ক্ষোভ ছিল, অভিযোগ ছিল যেগুলি ধরে বিস্ফোরণটা হয়। দাহ্য পদার্থের মজুদ না থাকলে যেমন অগ্নিকাণ্ড হয় না, মানুষের ক্ষোভ না থাকলে কালার রেভল্যুশন হয় না।

(২) আরেকটা অবজেক্টিভ কন্ডিশনও থাকতে হয়—মানুষের ক্ষোভ আছে, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের বা নিবারণের কোনো পথ নেই। দেশে যদি ক্ষোভ নিবারণের পথ থাকে, অর্থাৎ সরকারের ওপর রেগে গেছে মানুষ বা পুঞ্জীভূত ক্রোধ জমা হয়েছে, সেটা যদি নিবারণের পথ থাকে তাহলে সেখানে কালার রেভল্যুশন হয় না। পথটা কিন্তু কঠিন কিছু না। মানুষের কথা বলার অবারিত স্বাধীনতা, সেই সাথে নিয়মিত বিরতিতে স্বাভাবিক নির্বাচন আর গণতান্ত্রিক আচরণ। এগুলি থাকলে যেটা হয়, মানুষের ক্ষোভ ভোটের মাধ্যমে বা কথার মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রশমিত হয়। মানুষকে তখন আর চাইলেও কেউ নৈরাজ্যের পথে নিয়ে যেতে পারে না।

এর মানে হচ্ছে যে, কালার রেভল্যুশনের জন্য বাস্তব অবস্থা তৈরির দায়টা কিছুটা ক্ষমতাসীনদের ভাগেও যায়; অথবা বলতে পারেন ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতাই কালার রেভল্যুশনের পথ করে দেয়। তথাপি, আসলেই যদি কেউ বিদেশি শক্তির মদদে দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকার উৎখাত করে সেটা তো ভয়ংকর কথা। এখন ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াতের বরাত দিয়ে যেসব তথ্য আসছে—একটি বিশেষ ধরনের বুলেট, বিশেষ ধরনের রাইফেল ও প্রশিক্ষিত স্নাইপারদের উপস্থিতি, হত্যার ধরন ইত্যাদি—এইসব দেখেশুনে তো জনমনে এই ধারণা নিশ্চিত হবে যে চব্বিশের এই আন্দোলন আসলে একটা ষড়যন্ত্রের ফসল, আর কিছু না। এইটা তো দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভালো কিছু না আরকি।

(৩) না, চব্বিশের সেই আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণও ছিল। এটা অস্বীকার করতে পারবেন না। যারা শেষদিকে অনেক তরুণের মৃত্যু দেখে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, ওদেরকে আপনি দোষও দিতে পারবেন না। আবার ষড়যন্ত্র যে ছিল সেটাও দৃশ্যত সত্যি। সেই অর্থে এটা কোনো বিপ্লব ছিল না, আর যদি কেউ এটাকে বিপ্লব বলতেও চান—সেটা ব্যর্থ হয়ে গেছে বা একটা ব্যর্থ বিপ্লব। শেখ হাসিনার সরকারের উৎখাত ছাড়া এই অভ্যুত্থানের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শগত অবস্থান ছিল না, দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিও ছিল না। যাই-ই থাক, সেইসব তো এখন অতীত হয়ে গেছে। এখন কিন্তু একটা নিরপেক্ষ সার্বিক তদন্ত হওয়া দরকার।

ভালো হয় আরও এক-দুই বছর পর তদন্তটা শুরু করলে। পুলিশের একটা তদন্ত এখনই হতে পারে; পুলিশ হত্যার ঘটনা নিয়ে একটা তদন্ত তো খুব শিগগিরই শুরু হবে দেশব্যাপী। সেটা হোক। সার্বিক তদন্তটা কিছুদিন পর করলে নিরাসক্ত নৈর্ব্যক্তিক লোকজন পাওয়া যাবে, সকলের আবেগের দিকটা একটু স্থিত হয়ে আসবে, তখন বাস্তব ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া যাবে। আবার বেশি দেরিও করা ঠিক হবে না—কেউ কেউ মরে-টরে যেতে পারে, স্মৃতি নষ্ট হবে। কিন্তু তদন্তটা জরুরি। বর্তমানের জন্য তো বটেই, ভবিষ্যতের জন্যও। নৈর্ব্যক্তিক নিরাসক্ত কিন্তু সার্বিক রাজনৈতিক তদন্ত। সেরকম দেখলে বিচারও।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, অবসান ঘটছে দীর্ঘ ২৩ বছরের অধ্যায়ের

এমবাপ্পেদের ‘শ্বাস রোধ’ করে ফাইনালে স্পেন

হামের উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭৫৯

মা-বাবার হাতে কিশোরী খুন, বস্তাবন্দী করে মোটরসাইকেলে লাশ সড়কে ফেলেন বাবা

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর দাবি / আইনি লড়াই করতেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা

চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি, ঢল ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩০

মার্শাল আর্টের আড়ালে বোমার চর্চা: ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাবির

বগুড়ায় মিল মালিকের হাত-পা বেঁধে নৃসংশ হত্যাকাণ্ড, ট্রান্সফরমারের মালামাল লুট

সুপার টাইফুন ‘বাভি’র তাণ্ডব: লণ্ডভণ্ড মার্কিন দ্বীপপুঞ্জ রোটা ও গুয়াম

৮ কোটি টাকা বিতরণে পরামর্শক ও আমলাদের খরচ ৫৩ কোটি

১০

পরকীয়ার অভিযোগে তরুণ ও গৃহবধূকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, জোরপূর্বক বিয়ে

১১

খাগড়াছড়িতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে শাহিনের মৃত্যুদণ্ড

১২

জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

১৩

খাগড়াছড়িতে দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের জেরে গোলাগুলি, নিহত ৩

১৪

৬ জুলাই ১৯৭১: মুক্তাঞ্চলে জনপ্রতিনিধিদের শপথ, পাকিস্তানের মিথ্যাচার ও কিসিঞ্জারের অবরুদ্ধ যাত্রা

১৫

নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ‘শিখা অনির্বাণ’

১৬

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: ট্র্যাজেডি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান নিরাপত্তা সমীক্ষা

১৭

জাপানের জমাট রক্ষণ চূর্ণ করে ব্রাজিলের উল্লাস

১৮

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

১৯

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

২০