
(১)
মার্টিন হাইডেগার নামে একজন দার্শনিক ছিলেন, আপনারা অনেকেই ওঁর নাম জানেন, গত শতকের অন্যতম বিখ্যাত দার্শনিক। জার্মানির ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন, ১৯৩৩-৩৪ সনে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রেক্টর ছিলেন তিনি। হিটলারের নেতৃত্বে যখন নাজি পার্টি ক্ষমতা গ্রহণ করলো, তারপর এই অধ্যাপক যে ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই গল্প বলি আপনাদের জন্য। তার আগে খুবই সাধারণভাবে বলে নিই ফ্যাসিস্ট ও ফ্যাসিজমের বৈশিষ্ট্যগুলি। ফ্যাসিস্ট কথাটা ইতালি থেকে, মুসোলিনির পার্টির নাম থেকে এসেছে। তবে কথাটা মুসোলিনি ও হিটলার দুজনের রাজনৈতিক নীতিই বুঝায়।
ফ্যাসিস্টদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ওরা যেটা ঠিক মনে করে সেটাকেই ওরা পরম সত্য মনে করে এবং ওদের মতের বিরুদ্ধে কাউকে কথা বলতে দেয় না। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে প্রতিপক্ষকে হত্যা করা ওদের কাছে ঠিক কাজ। ভিন্নমতের কোনো পত্রিকা থাকতে পারে না, ভিন্নমতের কেউ বই লিখতে পারবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারবে না। ওরা নিজের একটা সাংস্কৃতিক রূপরেখা ঠিক করে, এর বাইরে যারাই আছে ওদেরকে ফ্যাসিস্টরা ধ্বংস করে, ওদের বই পুড়িয়ে দেয়, শিল্পীদের বিতাড়িত করে, সিনেমা বন্ধ করে দেয় আর ওদেরকে চিহ্নিত করে দেশের শত্রু হিসেবে। আর যে জনগোষ্ঠীকে ওরা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ওদেরকে গণহারে হত্যা করে নির্মূল করে দিতে চায়।
(২)
হাইডেগারের মতো অধ্যাপকদের সম্পর্কে এমনিতে আমরা কী মনে করি? আমরা মনে করি যে এরা একটু উদার হবেন, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হবেন এবং ফ্যাসিস্ট প্রবণতা সহ্য করবেন না। হাইডেগার সাহেব ছিলেন উল্টো। তিনি যখন রেক্টর ছিলেন তখন তিনি তাঁর সহকর্মী অধ্যাপকদের মধ্যে যারা একটু উদার বা কমিউনিস্ট মতবাদের অনুসারী ছিলেন ওদের তালিকা করে হিটলারের প্রশাসন ও এসএস বাহিনীকে হস্তান্তর করতেন। প্রশাসন সেইসব অধ্যাপকদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিত আর এসএস বাহিনীর ছেলেরা এসে ঐরকম অধ্যাপকদের ধরে নিয়ে যেত, মারধর করতো, কখনো কখনো হত্যাও করতো।
হাইডেগার সাহেবের অনন্য কীর্তি হচ্ছে হেরমান স্টাউডিঙ্গার ও এডমুন্ড হুসার্ল-এর বিরুদ্ধে নাজি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লেখা। স্টাউডিঙ্গার রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অধ্যাপক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও শান্তির পক্ষে কথা বলতেন। তিনি প্যাসিফিস্ট ছিলেন এটাই ছিল তাঁর অপরাধ। আর এডমুন্ড হুসার্ল ছিলেন হাইডেগারের একসময়কার গুরু। গুরুকেও ছাড়েননি তিনি, কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকেও বহিষ্কার করিয়েছেন। ভাবুন, এতো বড় দার্শনিক, কোথায় তিনি বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে থাকবেন, বহুমতের পক্ষে কথা বলবেন; না, উল্টো হয়ে গিয়েছিলেন নাৎসিদের দালাল।
(৩)
এইরকম আরও অধ্যাপক ছিল সেই সময় জার্মানিতে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন একজন আলফ্রেড বিউমলার। এই লোক তো রীতিমতো বক্তৃতা করে নাৎসিদের পক্ষে এবং ভিন্নমত দমনের পক্ষে ছাত্রদেরকে উত্তপ্ত করতেন। আপনাদেরকে আমি ১৯৩৩ সনের মে মাসের বার্লিন বই পোড়ানো উৎসবের কথা বলেছি আগে। এরিখ মারিয়া রেমার্ক, হেনরিখ হাইনে, বার্টোল্ট ব্রেখট—ওদের বইও পোড়ানো হয়েছিল উৎসব করে। সেই উৎসবে অংশ নিয়েছেন এই প্রফেসর। কয়েকজন অধ্যাপককে তুলে দিয়েছেন এসএস-এর হাতে। তিনি ঠিক করে দিতেন কোন অধ্যাপককে রাখা যায় আর কোন অধ্যাপক 'জার্মান বিরোধী'।
ইন্টারেস্টিং জিনিস কী জানেন, ইতিহাস কখনো অতীত হয় না। ইতিহাস বারবার ঘুরে ঘুরে আসে, কখনো একটু পরিবর্তিত রূপে, কখনো ভিন্ন কোনো দেশে, ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপটে। আমাদের সাম্প্রতিক সময়গুলিতে আমার কেবল গত শতকের তিরিশের দশকের জার্মানির কথা মনে পড়ে। অধ্যাপকদের ওপর নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নির্যাতন, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর নির্যাতন। প্রতিটি ঘটনা যখন ঘটে আমার কাছে মনে হয়, আরেহ, এইরকম ঘটনা তো জার্মানিতে ঘটেছে নাৎসিদের সময়। কখনো হুবহু একইরকম, কখনো প্রায় একইরকম—ঘটনাগুলির চরিত্র কি একই!
(৪)
এবং কী বিস্ময়কর ব্যাপার দেখেন! আমাদের এখানেও অধ্যাপকরা আছে, হাইডেগারের মতো এতো বড় পণ্ডিত হয়তো নয়, কিন্তু দেশের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। চূড়ান্ত বিপন্ন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকরা যখন চেষ্টা করছে মানুষের কাছে পৌঁছাতে, স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরতে, তখন এইরকম অধ্যাপকরা পুরো নাৎসি স্টাইলে হুমকি মারে— ‘ওদের মুখে অনেক বোল ফুটেছে দেখছি’ বলে! আমার একটু আফসোস লাগে, এতো বড় অধ্যাপকরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না; নাৎসি ও ফ্যাসিস্টরা মানুষের বোল বেশিদিন বন্ধ করে রাখতে পারে না।
ইতিহাস আসলেই একটা মজার পাঠ। নাৎসিদের এইসব দালালেরা তখনও ভেবেছে যে ওরা ‘জার্মানপন্থী’ এবং ওরাই সহি আর অন্যরা মন্দ। আজকের যারা নাৎসিরা ওরাও একইরকম ভাবে। জার্মান নাৎসিরা বেছে নিয়েছিল কমিউনিস্ট ও ইহুদিদের। আমাদের নাৎসিরা কাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত আপনারা জানেন। ইন্টারেস্টিং পাঠ নয়? মনে হয় ইতিহাস দেখছি চোখের সামনে।
মন্তব্য করুন