

মেটিকুলাস ডিজাইনে এবং পশ্চিমাদের অর্থায়নে যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসা ড. ইউনুস দেশটাকে অন্ধকারের অতল গহবরে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে একের পর এক নানা চুক্তি করে যাচ্ছে বিদেশীদের সাথে। প্রায় দেড় বছরের মাথায় দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এছাড়া আরো একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, পাতানো এই নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার করে ভোটার প্রভাবিত করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
ঐতিহাসিক প্যারাডক্সের রাজনীতি
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। এই যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু সংগঠনের ভূমিকা ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার সাথে তাদের আদর্শিক সংঘাত এখনও বিদ্যমান। তবে রাজনৈতিক পলাতকতার এক বিচিত্র খেলায়, ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর এই দলটি আবারও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে।
প্রশ্ন হলো: একটি দল যার আদর্শিক ভিত্তিই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার স্তম্ভের বিপরীতে, তারা কীভাবে এই রাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: তারা যে কৌশলে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে, তা কি বাংলাদেশের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়?
সোশ্যাল মিডিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র: ধর্মের মার্কেটিং
টুইটার, ফেসবুক, টিকটক এবং হোয়াটসঅ্যাপ—সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম এখন ধর্মীয় রাজনীতির নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে:
১. কুরআন ছুঁয়ে শপথ: বিশেষ কিছু কেন্দ্রে ভোটারদের কুরআন ছুঁয়ে “দাঁড়িপাল্লা” প্রতীকে ভোট দেওয়ার শপথ করানো হচ্ছে। এটিকে “ঈমানী দায়িত্ব” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
২. ধর্মীয় স্লোগানের ফ্লাড: “ইসলাম রক্ষায় দাঁড়িপাল্লা”, “ধর্মের দাবি, দাঁড়িপাল্লার ভোট”—এ ধরনের স্লোগানে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ভরপুর।
৩. ভুয়া ফতোয়ার কারখানা: কিছু অসাধু উপাদান ভুয়া ফতোয়া তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে, যেখানে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দেওয়াকে ‘গুনাহ’ বলে দাবি করা হচ্ছে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ২০২৩ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৪ সালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নীতিমালা সত্ত্বেও এই প্রচারণা বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
নির্বাচন কমিশনের নীরবতা: একটি বড় প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির ৮(১) ধারা স্পষ্ট বলে: “কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক ধর্মীয় অনুভূতি আহত করতে পারেন এমন কোনো কাজ বা প্রচারণা চালাতে পারবেন না।”
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কুরআন ছুঁয়ে শপথ করানো, মসজিদে নির্বাচনী প্রচারণা, ধর্মীয় নেতাদের দিয়ে নির্দিষ্ট প্রতীকের পক্ষে কথা বলানো—এই সবই তো ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার। নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কেন সোচ্চার নয়?
গত সপ্তাহে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নই তুলেছিলেন। কিন্তু শুধু বিরোধী দলের বক্তব্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকছে। নির্বাচন কমিশন কেন এই কৌশলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না?
তরুণ প্রজন্ম: পরিবর্তনের হাতিয়ার?
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের তরুণ ভোটাররা এখন আর আগের মতো ধর্মীয় আবেগে সাড়া দিচ্ছেন না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘বাংলাদেশ ইলেক্টোরাল স্টাডি গ্রুপ’-এর গবেষণায় দেখা গেছে:
১৮-৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মাত্র ১৮% ধর্মীয় প্রচারণায় প্রভাবিত হন
৬৫% তরুণ ভোটার অর্থনৈতিক কর্মসূচি, চাকরি ও শিক্ষাকে প্রাধান্য দেন
৫৮% তরুণ বলেছেন, “যে প্রার্থী ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোট চাইবে, তার বিরুদ্ধে ভোট দেব”
এখানেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আশার আলো। তরুণ প্রজন্ম যুক্তি, তথ্য ও নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তারা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: কী বলছে বিশ্ব?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নভেম্বর ২০২৪-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে: “ধর্মকে নির্বাচনী মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করলে দুর্নীতি ও সুশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়।”
এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ধর্মের ব্যবহার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ করে।
রাজনৈতিক দ্বিচারিতা: সব দলেরই সমস্যা
এখানে একটি মজার কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো—ধর্মীয় কার্ড শুধু জামায়াত বা ধর্মভিত্তিক দলই খেলে না। বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই সুযোগ পেলে এই কৌশলের আশ্রয় নেয়।
বিএনপি জামায়াতের কৌশলকে সমালোচনা করলেও, তাদের নিজস্ব ইতিহাসেও ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের নজির রয়েছে।
আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
এমনকি ছোট দলগুলোরও নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় প্রতীক ও বক্তব্য ব্যবহৃত হয়।
এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, প্রয়োজন পড়লে সবাই ধর্মের দোহাই দেয়।
গ্রামীণ বনাম শহুরে বিভাজন: দুটি বাংলাদেশ
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকায় ৪২% কম শিক্ষিত ভোটার ধর্মীয় প্রতীকভিত্তিক প্রচারণাকে “বিশ্বাসযোগ্য” মনে করেন। অন্যদিকে শহুরে শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে এই হার মাত্র ১৮%।
এটা বাংলাদেশের শিক্ষা ও তথ্যপ্রবাহের বৈষম্যকেই নির্দেশ করে। যেখানে তথ্য পৌঁছায় না, সেখানে ধর্মীয় আবেগ কাজ করে। যেখানে তথ্যের প্রবাহ স্বাধীন, সেখানে যুক্তির জয়।
সমাধানের পথ: কী করা যেতে পারে?
১. নির্বাচন কমিশনের জোরদার ভূমিকা: ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নোটিশ দেওয়া নয়, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
২. মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা: ধর্মীয় কৌশলের খবর শুধু প্রকাশ করলে হবে না, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য পরিণতি বিশ্লেষণ করতে হবে।
৩. তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো: তরুণ প্রার্থীরা যেন পুরনো রাজনীতির কৌশল না অবলম্বন করেন, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
৪. সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং: সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় প্রচারণা মনিটরিং করা এবং দায়িত্বশীল প্ল্যাটফর্মগুলোকে এই বিষয়ে সহযোগিতা করতে বাধ্য করা।
৫. ভোটার শিক্ষা কার্যক্রম: সুশীল সমাজের উচিত ভোটারদের মধ্যে ধর্মীয় কৌশল চিহ্নিত করা এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করা।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ক্রসরোড
বাংলাদেশ আজ একটি ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে। একদিকে, পুরনো রাজনীতির আবেগ-অনুভূতির কারবার; অন্যদিকে, যুক্তি-তথ্য-নীতি নির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
আগামী নির্বাচন শুধু একটি সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচন এমনিতেই দেশকে আরো ভয়াবহ অস্থিরতার দিকে ফেলে দিবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়া ধর্ম যেভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এটা যদি রোধ না করি, তবে ভবিষ্যতে এর বিষবৃক্ষ আমাদের সমগ্র রাজনৈতিক প্রাঙ্গণকে অন্ধকার করে দেবে।
তরুণ প্রজন্মের সচেতনতাই এখন এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে যুক্তির পতাকা তুলে ধরতে। কারণ, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে যুক্তি, না আবেগ—এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের আগামী দিনের পথ দেখাবে। ধর্মকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
মন্তব্য করুন