

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ নিয়ে তীব্র বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটি এই চুক্তিকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, একটি অনির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন দীর্ঘমেয়াদী দায়বদ্ধতার চুক্তি করে গেল, তা বোধগম্য নয়।
শনিবার ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের ১৮০ দিন: করণীয় ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
বাণিজ্য চুক্তিতে ‘লুকোচুরি’ ও বিস্ময়
চুক্তিটি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, “শুরুতে আমাদের জানানো হয়েছিল যে শুধুমাত্র শুল্ক কমানো নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের সাথে যে চূড়ান্ত চুক্তিটি সই হলো, তা দেখে আমরা হতভম্ব ও স্তম্ভিত। একটি অনির্বাচিত সরকার এমন চুক্তির দায়ভার নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে যেতে পারে না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই চুক্তিটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতিবিরোধী এবং এতে বাংলাদেশের স্বার্থ চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বাড়তি শুল্কের বোঝা নিয়ে করা এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজনে নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে মার্কিন প্রশাসনের সাথে পুনরায় আলোচনার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
গভর্নর নিয়োগে ‘অস্বচ্ছতার’ অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা করেছে সিপিডি। ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে তড়িঘড়ি করে নতুন গভর্নর নিয়োগকে একটি ‘দুর্বল পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
গবেষণা পরিচালক বলেন, “আহসান মনসুর আর্থিক খাতের সংস্কারে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সসম্মানে বিদায় দেওয়া উচিত ছিল। ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে গভর্নর নিয়োগে একটি উচ্চপর্যায়ের সার্চ কমিটি থাকে, যা আমাদের এখানে অনুপস্থিত। বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াটি মোটেও স্বচ্ছ ছিল না।”
জ্বালানি ও পরিবেশ: কয়লা উত্তোলনে উদ্বেগ
বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের পথনকশায় কয়লা উত্তোলনের ইঙ্গিতের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। ড. মোয়াজ্জেম সতর্ক করে বলেন, “নতুন করে কয়লা উত্তোলন শুরু করলে তা বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর (Energy Transition) প্রক্রিয়ায় বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেবে।”
সিপিডি সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছে:
ফসিল ফুয়েল বর্জন: নতুন কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার নীতি গ্রহণ করা।
ক্যাপাসিটি পেমেন্ট: ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
গ্যাস অনুসন্ধান: এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সমুদ্রসীমায় (অফশোর ও অনশোর) গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া।
রাজস্ব সংস্কারের প্রস্তাব
দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে রাজস্ব খাতে লিকেজ বন্ধ এবং ভ্যাট কাঠামোকে সহজ করার প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। বর্তমানে বিদ্যমান জটিল ভ্যাট ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে তিন ধাপের (০%, ৫% এবং ১৫%) কাঠামোতে নিয়ে আসার এবং পরবর্তীতে একক হারে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিপিডি মনে করে, নতুন সরকারকে অতীতের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে বিদেশি বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মন্তব্য করুন