

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের আধুনিকায়ন—শুনতে নিছক উন্নয়ন প্রকল্প। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়ন কখনোই কেবল উন্নয়ন থাকে না; তার পেছনে থাকে প্রভাব, প্রতীক ও প্রস্তাবিত ভবিষ্যতের মানচিত্র। তুরস্কের সরকারি সহায়তা সংস্থা টিকার (TIKA) অর্থায়নে নির্মিত মেডিকেল সেন্টারের উদ্বোধন—তাই হঠাৎ করেই জাতীয় রাজনীতির আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্নটা সরল: এটি কি নিছক দাতব্য সহায়তা, নাকি নরম কূটনীতির (soft power) সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ? জাতীয় নির্বাচনের পরপরই কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ছেলে নেকমেতিন বিলাল এরদোয়ান ব্যক্তিগত বিমানে ঢাকা সফরে এলেন। সঙ্গে বিশ্বকাপজয়ী জার্মান ফুটবল তারকা মেসুত ওজিল ও টিকার চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ অ্যারন। এমন একটি সফর, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মিডিয়া কাভারেজ, শিক্ষার্থী উচ্ছ্বাস এবং কূটনৈতিক স্বচ্ছতার মধ্যে হওয়ার কথা—তা হলো নীরবতায়, রীতিমতন পর্দার আড়াল তোলে।
গোপনীয়তার এই রাজনীতি প্রশ্ন জাগায়। একজন ক্রীড়া তারকার সফর যেখানে তরুণদের জন্য উৎসবের উপলক্ষ হওয়ার কথা, সেখানে কেন এমন রাখঢাক? কেন বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের বৃহৎ অংশ আগে থেকে কিছুই জানল না? এ নিয়ে সন্দেহ অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ ইতিহাস বলে, আন্তর্জাতিক সহায়তা অনেক সময় মানবিকতার ভাষায় শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন রয়ে যায়—এই সফর কি কেবল চিকিৎসা সুবিধা উন্নয়নের মানবিক উদ্যোগ, নাকি দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের আরেকটি নীরব পদক্ষেপ? তাই আলোচনা এখন আর মেডিকেল সেন্টারকে ঘিরে নয়; আলোচনা হলো রাষ্ট্র, প্রভাব ও স্বচ্ছতার সীমারেখা নিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির, বিদেশি শক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের হারানো রাজনৈতিক অবস্থান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বিগত ডাকসু নির্বাচনের পর থেকেই ছাত্রশিবির অত্যন্ত সুকৌশলে তুরস্কের সঙ্গে এই প্রকল্পের বিষয়ে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল। আমার সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মতে, গত রমজানে অর্থ বিতরণ থেকে শুরু করে বর্তমানের এই সফর—সবই একইসূত্রে গাঁথা। আমরা মনে করছি, এটি কেবল উন্নয়ন নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী কৌশল।
ছাত্রদলের নেতারাও এই সফরের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
এই বিতর্ককে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আটকে রাখলে বড় ছবিটা আড়াল হয়ে যায়। আসল প্রশ্নটি আরও গভীরে—তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা কূটনীতি। গত কয়েক বছরে তুরস্ক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের তৈরি ড্রোন, ইউক্রেইন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে নতুন করে পরিচিতি পেয়েছে। এর পাশাপাশি অত্যাধুনিক রকেট লঞ্চার, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আঙ্কারা এখন দক্ষিণ এশিয়ায় বড় বাজার খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশ, তার ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক আধুনিকায়নের প্রয়োজনের কারণে, স্বাভাবিকভাবেই এই বাজারের লোভনীয় একটি কেন্দ্র।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি অস্ত্র বিক্রি কখনোই কেবল বাণিজ্য নয়—এটি রাজনৈতিক সম্পর্ক, কৌশলগত নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জোটের বিষয়। তাই তুরস্কের কৌশল শুধু সামরিক প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ নয়; তারা সাংস্কৃতিক ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে ‘সফট পাওয়ার’ গড়ে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতীকী ও প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি জানান দেওয়া নিছক সৌজন্য নয়—এটি এক ধরনের বার্তা। তরুণ প্রজন্মের মনে তুরস্ক-ঘেঁষা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হলে ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি বা জনমতের বাধা অনেকটাই কমে আসবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়। উন্নয়ন সহায়তা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষা প্রকল্প—এসব প্রায়শই বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের প্রাথমিক ধাপ।
আঙ্কারার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার অংশ। যদি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে প্রতিরক্ষা খাতে একচেটিয়া সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেটি হবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সাফল্য।
তুরস্ক গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বৃত্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে—এটি কাগজে-কলমে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। উচ্চশিক্ষার সুযোগ, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গবেষণার ক্ষেত্র—সবই তরুণদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু প্রশ্নটা এখানে থেমে নেই। অভিযোগ উঠছে, এই বৃত্তির বড় অংশ কেবল মেধা-নির্ভর নয়, বরং আদর্শ-সংবেদনশীল; অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারার প্রতি অনুকূল বা সহানুভূতিশীল শিক্ষার্থীদের বাছাই করে তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদের কেবল একাডেমিক শিক্ষা নয়, এক ধরনের আদর্শিক দীক্ষাও দেওয়া হচ্ছে—যা ভবিষ্যতে প্রভাবের বীজ হিসেবে কাজ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘এলিট কাল্টিভেশন’—ভবিষ্যৎ প্রশাসক, নীতিনির্ধারক বা সামরিক কর্মকর্তাদের ছাত্রজীবনেই একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা। আজ তারা শিক্ষার্থী; আগামী দিনে তারেই সচিব, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক বা জেনারেল হবেন। তখন সিদ্ধান্তের টেবিলে বসে তাদের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক, স্মৃতি ও মানসিক অনুরাগ প্রভাব ফেলতেই পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে সহায়তাকে অনেকেই দেখছেন বিনিয়োগ হিসেবে, যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে বৃহত্তর প্রভাব বলয় তৈরির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মেধা ও নেতৃত্বের আঁতুড়ঘর। এখানে মানবিক সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়। আর সেই ভাবমূর্তিই ভবিষ্যতের সম্পর্কের ভিত্তি। বিদেশে পড়াশোনা করা মানেই কেউ বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন—এমন সরলীকরণ বিপজ্জনক।
তাই আলোচনাটা আবেগ দিয়ে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও নীতিগত ভারসাম্যের প্রশ্ন দিয়ে হওয়া উচিত। বাংলাদেশ কি বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখছে, নাকি অজান্তেই কোনো এক শক্তির প্রভাব বলয়ে ঢুকে পড়ছে?
তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে ‘নব্য-অটোমানবাদ’ (Neo-Ottomanism) এখন আলোচ্য বিষয়। এর মূল লক্ষ্য—প্রাক্তন সাম্রাজ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করা, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে। আঙ্কারা এই নীতির আওতায় ‘এশিয়া আনইউইন্ড’ নীতি প্রয়োগ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বিকল্প প্রভাব বলয় গড়ে তুলতে চায়, যেখানে মূল ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়রা অন্য রকমভাবে চিন্তা করে। ডি-৮ জোটের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর নেতৃত্বে তুরস্কের আগ্রহ স্পষ্ট; তারা চাইছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে।
বিশ্লেষকরা দেখছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্পর্শকাতর শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রকে টিকার মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে—এটি নিছক দাতব্য বা মানবিক উদ্যোগ নয়। বরং এটি আঙ্কারার দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি সূক্ষ্ম ধাপ। ড্রামা সিরিজ, শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম, বৃত্তি ও দাতব্য প্রকল্প—এসবের মাধ্যমে তৈরি ‘সফট পাওয়ার’ এখন সরাসরি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় প্রবেশ করছে।
বিলাল এরদোয়ান সফরের দ্বিতীয় দিনে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন। এ নিয়েও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেখানে তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কার্যক্রম প্রসারের নামে স্থানীয় বা বিদেশি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের বিতর্কিত ভূমিকার ইতিহাস থাকায় বাংলাদেশের মতো দেশে তাদের অতি-তৎপরতা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার চেয়েও শক্তিশালী কোনো ‘প্যারালাল নেটওয়ার্ক’ এই সফর তদারকি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র আধুনিকায়ন নিঃসন্দেহে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু সেই উন্নয়নের উৎস এবং উদ্দেশ্য যদি রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের মতে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মৌলিক চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের; কোনো বিদেশি এনজিও বা বিশেষ এজেন্ডাসম্পন্ন রাষ্ট্রের নয়। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, উন্নয়নের আড়ালে বিদেশি আদর্শিক রাজনীতি বা অস্ত্র ব্যবসার প্রলোভন যেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে বাধাগ্রস্ত না করে। বিদেশি অনুদানের প্রতিটি টাকার পেছনে কী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে, তার সঠিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা উন্নয়নের এই আবরণ ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ বা উগ্রপন্থার প্রসারে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদ।
প্রথম প্রকাশ: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মন্তব্য করুন