ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

‘বাংলাদেশ’ শব্দটি যেভাবে আমাদের হলো

‘বাংলাদেশ’ শব্দটি যেভাবে আমাদের হলো

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে একটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটে—বাংলাদেশ। আজ আমরা যে ‘বাংলাদেশ’ নামে নিজেদের পরিচয় দিই, এই শব্দটির প্রাপ্তি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ভাষাগত বিবর্তন, শতাব্দীর সাহিত্যিক আরাধনা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের রক্তঝরা ইতিহাস। চর্যাপদের কাল থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর তর্জনীর হেলুনি পর্যন্ত—এই যাত্রাপথটি ছিল সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ।

সাহিত্যের দর্পণে বাংলাদেশ

স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বহু আগে থেকেই ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি কবি-সাহিত্যিকদের হৃদয়ে ও কলমে ঠাঁই করে নিয়েছিল। উনিশ শতকের সাহিত্যে অবিভক্ত বাংলাকে প্রায়শই ‘বঙ্গদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ’ বলে সম্বোধন করা হতো।

আধুনিক বানানে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটির বহুল ব্যবহারের কৃতিত্ব কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর কালজয়ী গান— ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি / তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!’ শব্দটিকে বাঙালির জাতীয় চেতনায় গেঁথে দেয়। রবীন্দ্র রচনাবলীতে অন্তত ৩২ বার এই শব্দটির সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের লেখকদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্রের রচনাতেও এই জনপদের নাম এসেছে। ১৯২৯ সালে জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথকে লেখা এক চিঠিতে ‘বাংলাদেশের নবীন লেখক’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৩২ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বনগীতি’ গ্রন্থে লিখলেন— ‘নমঃ নমঃ নমো বাঙলাদেশ মম / চির মনোরম চির মধুর’। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯৪৭ সালের দিকে তাঁর ‘দুর্মর’ কবিতায় লিখেছিলেন— ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ / কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে’। অর্থাৎ, রাজনৈতিক মানচিত্র আঁকার আগেই কবিরা তাঁদের কল্পনায় এই ভূখণ্ডের একটি মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র এঁকেছিলেন।

রাজনৈতিক দাবির উন্মেষ (১৯৬২-১৯৬৫)

বিশ শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন যখন দানা বাঁধতে শুরু করে, তখন থেকেই ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামটির পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ’ ব্যবহারের রাজনৈতিক তাগিদ অনুভূত হয়। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের সময় ‘অস্থায়ী পূর্ববঙ্গ সরকার’ বা ‘অপূর্ব সংসদ’ গঠিত হয়। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে এই সংগঠনের ইশতেহারে বারবার বাঙালির শোষণ-বঞ্চনার কথা তুলে ধরা হয়। ১৯৬৫ সালের ১ অক্টোবর অধ্যাপক আহমেদ শরীফ লিখিত অপুর (অপূর্ব সংসদ) তৃতীয় ইশতেহারে স্পষ্ট করে বলা হয়— ‘আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ’। এই ইশতেহারটি শেষ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি দিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা: ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯

‘বাংলাদেশ’ শব্দটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক বৈধতা দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, এই জনপদের নাম থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন, “একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ...জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি—আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।” বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাই ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের নামকরণের চূড়ান্ত ভিত্তিপ্রস্তর।

স্লোগান ও ইশতেহারে বাংলাদেশ

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সত্তর ও একাত্তর পর্যন্ত রাজপথ মুখরিত ছিল ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগানে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের প্রচারপত্রেও ‘বাংলাদেশ গঠন’ ও ‘বাঙালি জাতি সৃষ্টি’র কথা বলা হয়।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে পঠিত স্বাধীনতার ইশতেহারে দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও দুইবার ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, যা সাত কোটি মানুষের মনে স্বাধীনতার বীজ বুনে দেয়।

স্বাধীনতা ঘোষণা ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে গণহত্যা শুরু করলে, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (১২টা ২০ মিনিটে) বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর সেই শেষ বার্তার প্রথম বাক্যটিই ছিল— “This may be my last message, from today Bangladesh is independent” (এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন)।

১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা Proclamation of Independence-এ এই ভূখণ্ডকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ নামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অবশেষে, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর যখন স্বাধীন দেশটির প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়, তখন এর সাংবিধানিক নাম হিসেবে স্থায়ী মর্যাদা পায় ‘বাংলাদেশ’।

আজকের বাংলাদেশ কেবল একটি নাম নয়; এটি রবীন্দ্রে-নজরুলের সাহিত্যিক আবেগ, সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বঙ্গবন্ধুর অদম্য সংগ্রামের ফসল। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই শব্দটি আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা, আমাদের গর্বের পরিচয়।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

শেখ জামাল: এক অকুতোভয় বীর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকার

নতুন সরকারের আড়াই মাসে ১ হাজার ১৩০টি হত্যা-ধর্ষণ মামলা

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরে শুরু হলো ইউরেনিয়াম লোডিং

ফজলুর রহমানের মন্তব্যে তোলপাড় সংসদ / শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতের রাজনীতি করা অসম্ভব

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

১০

পুলিশি বাধায় পিছু হটেননি সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা / নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি

১১

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক মির্জা ফখরুলের

১২

মুক্তিযুদ্ধের দলিলচিত্রের রূপকার কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

১৩

২৬ এপ্রিল ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল

১৪

ইউনূসের ১৮ মাস / অর্থনীতির গভীর ক্ষত ও এক ‘ফোকলা’ উত্তরাধিকারের খতিয়ান

১৫

তপ্ত জনপদে অন্ধকারের শাসন

১৬

জয়পুরহাটের পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যায় আজও আতঙ্কিত স্বজনহারা পরিবার

১৭

২৫ এপ্রিল ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমীকরণ

১৮

২৪ এপ্রিল ১৯৭১: সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম

১৯

২২ এপ্রিল ১৯৭১: মুক্তির বারুদ আর পৈশাচিকতার কালো ছায়া

২০