ঢাকা শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

পতাকা উত্তোলন দিবস যেন হারিয়ে না যায়

এ এইচ এম ফিরোজ আলী
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
পতাকা উত্তোলন দিবস যেন হারিয়ে না যায়

যে কোনো রাষ্ট্র বা জাতির মুক্তি বা স্বাধীন সার্বভৌমত্বের প্রতীক হচ্ছে পতাকা। স্বাধীনতার পতাকা অর্জনের জন্য যুগে যুগে আন্দোলন-সংগ্রাম-সশস্ত্র যুদ্ধ ও আত্মদান করেছেন অনেক জাতি। ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভারতীয় জাতীয় পতাকা ‘তিরঙ্গা’, পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ‘চাঁদ-তারা’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ‘লাল-সবুজ’। ভারতীয় দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের বাঁকে বাঁকে অনেকবার পতাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর প্রস্তাবে ভারতীয় পতাকার নকশা অনুমোদন করা হয়। তারপর ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে লাহোরের রাভি নদীর তীরে জওহরলাল নেহরু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রথম সত্য ও অহিংস পন্থায় ‘স্বরাজ’ পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলনের ১৭ বছর পর ১৯৪৭ সালে ভারত শাসন আইনের আদেশানুসারে ভারতের স্বাধীনতা গ্রহণ করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তানের চাঁদ-তারা পতাকা গ্রহণ করা হয়। পাকিস্তান পতাকার ডিজাইনার হচ্ছেন সৈয়দ আমির উদ্দিন কিদওয়াই। ১৯০৬ সালে পাকিস্তান মুসলিম লিগের পতাকাকে ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ‘চাঁদ-তারা’।

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সিরাজুল আলম খানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় অনুমোদিত হয়। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (ইকবাল হল) ১১৮ নম্বর কক্ষে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম, হাসানুল হক ইনু ও শিবনারায়ণ দাস পতাকা নকশা তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকে কাজী আরেফের প্রাথমিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে আলোচনা শেষে গাঢ় সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারপর ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ১১৬ নম্বর কক্ষে রাত ১১টার পর বাংলাদেশের পতাকার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক লাল-সবুজের বৃত্তের ওপর পূর্ব বাংলার চিত্র আঁকেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্ম শিল্পী শিবনারায়ণ দাস। পুরো পতাকার ডিজাইন সম্পন্ন করার পর সেই রাতেই ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার বলাকা ভবনের তৃতীয় তলায় ছাত্রলীগের অফিসের পাশে ‘নিউ পাক ফ্যাশন’ টেইলার্সের দর্জি খালেক মোহাম্মদি পতাকার নকশা বুঝে নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ভোরের মধ্যেই কয়েকটি পতাকা তৈরি করেন। ৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুমিল্লায় হানা দিয়ে শিবনারায়ণ দাসকে না পেয়ে তার পিতা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক সতীশচন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু তা-ই নয়, মাইকিং করে শিবনারায়ণ দাসের মাথার দাম ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পাকিস্তানি বাহিনী। ৬৯-এর শিক্ষা আন্দোলনেও জেল খেটেছেন শিবনারায়ণ দাস এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১৭ নম্বর আসামি ও কুমিল্লা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। শিবনারায়ণ দাস ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছিলেন।

৭১-এর ১ মার্চ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হোটেল পূর্বাণীতে চলছিল। হঠাৎ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেলা ১টা ৫ মিনিটে এক বেতার ভাষণে পূর্বনির্ধারিত ৩ মার্চের ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণার পর মুহূর্তেই পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি পালটে যায়। উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো পূর্ব বাংলা। ভীমরুলের মতো পূর্ব বাংলার মানুষ উত্তেজিত হয়ে রাজপথে নেমে আসে। ২ মার্চ স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতাল আহ্বান করেন।

২ মার্চ ঢাকায় স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয় এবং পাকিস্তানি সরকার কারফিউ জারি করে। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বেলা ১১টায় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর আহ্বানে আয়োজিত সভায় লাখ লাখ ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলনের সময় ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’—স্লোগানে স্লোগানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রকম্পিত হয়। এ বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নূরে আলম সিদ্দিকী। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য করে তোলেন। হরতাল চলাকালে সামরিক বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত ও ৬০ জন আহত হন।

২ মার্চ পতাকা উত্তোলন ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মৃত্যুপরোয়ানা। পতাকা উত্তোলনের সময় ছিলেন শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ ছাত্রলীগের তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতারা। পতাকা উত্তোলনের সময় আ স ম আব্দুর রব বলেছিলেন, ‘আজ থেকে এটাই স্বাধীন বাংলার পতাকা।’

৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা ও পাঠ করেন। ইশতেহারে বলা হয়, ৫৫ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল ভৌগোলিক এলাকার ৭ কোটি মানুষের আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম এখন ‘বাংলাদেশ’। প্রথম এ দিন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাওয়া হয়। পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা সর্বত্র উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র থাকাবস্থায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের নামকরণ করে এদিন পতাকা উত্তোলন করা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ৭১-এর ২ মার্চ বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন। এ দিনে বাংলার মানুষের স্বাধিকারের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল এবং তা যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সময়ের ব্যবধানে আমরা যেন এ দিবসের কথা ভুলে না যাই। নতুবা কোনো এক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপস্থিতিতে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হয়ে যাব। প্রতি বছর ২ মার্চ বাংলার প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ঘরে ঘরে একটি করে লাল-সবুজের শহিদের রক্তমাখা পতাকা উড়ুক, মিছিলে মিছিলে একাত্তরের চেতনায় জাগ্রত হয়ে উঠুক—পতাকা দিবসে এটা যেন হয় আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১০

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১১

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১২

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১৩

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১৪

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৫

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৬

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৭

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৮

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৯

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

২০