১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন, যা দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অজস্র ঘটনার মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছে। এই যুদ্ধের প্রতিটি দিনই ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে রাজনৈতিক, সামরিক এবং সামাজিক ঘটনাবলী একত্রিত হয়ে একটি নতুন জাতির জন্মের পথ প্রশস্ত করেছে। ৩১ আগস্ট ১৯৭১-এর দিনটি ছিল এমনই একটি দিন, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মন্তব্য, আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ, প্রবাসী বাঙালিদের তৎপরতা, পাকিস্তানের প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অভিযানের মতো ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছে। এই দিনের ঘটনাবলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথকে আরও দৃঢ় করেছে, যা শেষ পর্যন্ত বিজয়ের দিকে অগ্রসর হয়েছে। নিম্নে এই দিনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো, যাতে রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রের অভিযান পর্যন্ত সবকিছু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইন্দিরা গান্ধীর মন্তব্য: স্বীকৃতির প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান
এই দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর তিনি সাংবাদিকদের সামনে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়ে অনেক হইচই চলছে এবং এই প্রশ্নটি বহুবার উঠেছে। তবে ভারত সরকার কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে, যা এক অর্থে বাংলাদেশের স্বীকৃতিরই সমতুল্য। ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট করে বলেন, "আমি স্বীকৃতির বিরোধী নই।" তবে তিনি যোগ করেন যে, এখনই স্বীকৃতি দিয়ে সস্তা বাহবা কুড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে ঠিক সময়ে, যখন তা সবচেয়ে কার্যকর হবে। বর্তমানে প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের জনগণকে উদ্ধার করা এবং তাদের সাহায্য করা। তিনি আশ্বাস দেন যে, জয় তাদের হবেই, কারণ সমগ্র দেশের জনগণ তাদের পাশে রয়েছে। এই মন্তব্যটি ভারতের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে এবং শরণার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে।
মুম্বাইয়ে গণহত্যার প্রতিবাদ এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবি
বাংলাদেশে চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে এই দিনে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন উর্দু দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকেরা একটি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা মুম্বাইয়ে পাকিস্তানের উপ-হাইকমিশনের সামনে জমায়েত হয়ে প্রতিবাদ জানান এবং সেখানে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। এই বিক্ষোভটি ভারতের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যা দেখায় যে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু বাংলাদেশ বা ভারতের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। উর্দু পত্রিকার সম্পাদকদের এই উদ্যোগ পাকিস্তানের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি সংহত প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা যায়।
পিটার শোরের দিল্লিতে বক্তব্য: নতুন জাতির জন্মের প্রসববেদনা
ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী এবং কমন্স সভার লেবার পার্টির সদস্য পিটার শোর এই দিনে দিল্লিতে সাংবাদিকদের সামনে একটি গভীর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা পুরোনো পাকিস্তানের মৃত্যুযন্ত্রণা এবং একটি নতুন জাতির জন্মের প্রসববেদনা। বিশ্বের সামনে এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, এই নবজাতককে নিদারুণ দুঃখকষ্টে ফেলে রাখা হবে, নাকি গণতন্ত্র ও শান্তির পথে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পিটার শোর আরও জানান যে, তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ আরও দুজন মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো সমাধানে রাজি নন। এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশের আন্দোলনকে সমর্থন প্রদান করে এবং বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রবাসে বাঙালিদের তৎপরতা: আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ
প্রবাসী বাঙালিরা এই যুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ সরকারের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অনুরোধে, ব্রিটেনপ্রবাসী বাঙালি ছাত্রদের নেতা মোহাম্মদ হোসেন মঞ্জু ৩১ আগস্ট রোমানিয়ায় 'বিজ্ঞান ও বিশ্ব শান্তি' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত করেন। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সদস্য জেরি স্মিথের সঙ্গে কথা বলে তিনি পাকিস্তানে সমরাস্ত্র প্রেরণ বন্ধ করার অনুরোধ জানান। এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন, যারা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে যথাসাধ্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।
মোহাম্মদ হোসেন পরে সম্মেলনের সভাপতি সুইডেনের খ্যাতনামা অধ্যাপক অ্যালভেনের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত দলিলপত্র এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর একটি চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেন। অধ্যাপক অ্যালভেন প্রতিশ্রুতি দেন যে, পরদিন সম্মেলনের মূল অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উত্থাপন করবেন। এই তৎপরতা প্রবাসী বাঙালিদের আন্তর্জাতিক লবিংয়ের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যা যুদ্ধের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে।
পাকিস্তানের অসামরিক প্রশাসন ফেরানোর অপচেষ্টা
রাওয়ালপিন্ডিতে এই দিনে ঘোষণা করা হয় যে, অসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক গভর্নর টিক্কা খানের পরিবর্তে বেসামরিক গভর্নর হিসেবে ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিককে এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজিকে সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেছেন। টিক্কা খান আগে গভর্নর এবং সামরিক আইন প্রশাসক—দুই পদেই ছিলেন। ঘোষণায় বলা হয় যে, বেসামরিক গভর্নর নিয়োগ করা হলেও সেনাবাহিনী আগের মতোই কাজ চালিয়ে যাবে। এটি পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল, যা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে স্বাভাবিকতা দেখানোর চেষ্টা।
এছাড়া, ব্রিটিশ হাইকমিশন ঘোষণা করে যে, বিদেশি পত্রপত্রিকার ওপর পাকিস্তান সরকার সেন্সর বিধি প্রয়োগ করায় তারা সব ব্রিটিশ পত্রপত্রিকার বণ্টন স্থগিত রেখেছে। পাকিস্তান সরকার যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দূতাবাসকে পাকিস্তানবিরোধী রচনাসংবলিত পত্রপত্রিকা বিলি না করার অনুরোধ করেছে। এটি পাকিস্তানের সেন্সরশিপ নীতির একটি উদাহরণ, যা যুদ্ধের খবর ছড়ানো রোধ করার চেষ্টা করেছে।
ছিরামিসি গণহত্যা: পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতা
এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল এবং কিছু রাজাকার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থেকে কয়েকটি নৌকায় ছিরামিসি বাজারে যায়। রাজাকারদের মাধ্যমে গ্রামের মানুষদের ছিরামিসি উচ্চবিদ্যালয়ে জমায়েত করা হয়। এরপর সমবেত গ্রামবাসীকে কয়েকটি দলে বিভক্ত করে কোনো কোনো দলকে নিকটবর্তী পুকুরপাড়ে সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। এভাবে পাকিস্তানি সেনারা ছিরামিসি গ্রামের ১২৬ জন নিরীহ, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। এছাড়া তারা জনশূন্য ছিরামিসি গ্রাম ও বাজারে লুটতরাজ চালায় এবং দোকান ও ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এই গণহত্যা যুদ্ধের নির্মমতার একটি কালো অধ্যায়, যা বাংলাদেশের জনগণের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে।
মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অভিযান: যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসী প্রতিরোধ
মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা এই দিনে কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালান। একটি দল ঢাকার সূত্রাপুর থানায় বোমা নিক্ষেপ করলে পাকিস্তান-অনুগত কয়েকজন পুলিশ হতাহত হয়। আরেকটি গেরিলা দল কলাবাগানে পাকিস্তান-অনুগত পুলিশের ওপর হামলা করলে তিন-চারজন হতাহত হয়। আরও দুটি দল যথাক্রমে কালিগঞ্জ-ডেমরা এবং কালিগঞ্জ-টঙ্গীর মধ্যবর্তী বিদ্যুৎ পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত করে। নরসিংদীতে অন্য গেরিলারা শিবপুর থানায় হামলা করলে থানা ও রাজস্ব অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা-কুমিল্লা সড়কের ভাটেরচরের কাছে সড়ক সেতুতে অবস্থানরত গেরিলারা পাকিস্তানিদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কিছু পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারকে হতাহত করে। গেরিলারা সেতুটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে ঢাকা-কুমিল্লা সড়কের যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়।
শেরপুরের নকলা উপজেলার নারায়ণখোলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় ৫০ জন সাধারণ মানুষ শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদেরও বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এই অভিযানগুলো মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধকৌশলের সফলতা প্রমাণ করে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে দুর্বল করে।
এই দিনের ঘটনাবলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে, যা রাজনৈতিক সমর্থন, আন্তর্জাতিক লবিং, নির্মম গণহত্যা এবং সাহসী প্রতিরোধের মিশ্রণ। এগুলো সব মিলিয়ে যুদ্ধের বিজয়কে অনিবার্য করে তোলে।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও এগারো; প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি, আবু সাঈদ চৌধুরী, ইউপিএল; স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশন্স, লন্ডন; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ১ ও ২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
মন্তব্য করুন